Story  Name  : The Most Dangerous Game (দ্যা মোস্ট ডেঞ্জারাস গেইম )
Written  by       : Richard Connell

” এইতো , সামনে যেয়ে বামদিকে গেলেই —– কোথাও — একটি বড় দ্বীপ আছে , ” হুইটনি বললো । ” বরং এটি আরও রহস্যময় বিষয় — ”

” কি দ্বীপ এটি ?” রেইন্সফোর্ড জিজ্ঞেস করলো ।

” পুরান মানচিত্র এটিকে “শিপ ট্র্যাপ আইল্যান্ড ” বলে ” হুইটনি উত্তর দিলো । ” নামে তো কিছু একটা ইঙ্গিত বহন করে , তাই না ? নাবিকদের অদ্ভুত ধরণের ভয় কাজ করে । কেন তা জানি না । কিছুটা কুসংস্কার —- ”

” দেখতে পারছি না , ” রেইন্সফোর্ড বললো । “এটি দেখতে পাচ্ছি না।” রেইন্সফোর্ড বলল। গ্রীষ্মের এক রাতে ঘুটঘুতে অন্ধকারে সামনের দিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেল না ।

“তোমার দৃষ্টি ভালো , ” হাসি দিয়ে হুইটনি বললো । আমি চারশ গজ দূরে বাদামি পাতার ঝোপ ঝাড়ে তোমাকে হরিণ শিকার করতে দেখেছি । আর তুমি এই চার মাইল দুরের কোন জিনিষ দেখতে পারছো না । ”

“চার গজও না , ” রেইন্সফোর্ড সম্মত করে বললো । ” উফ্‌ , মনে হচ্ছে স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার । ”

“রিওতে এটি অনেক ফর্সা হবে । ” হুইটনি জোর দিয়ে বললো । ” আমাদেরকে কিছুদিনের মধ্যে তৈরি করতে হবে । মনে হয় , পার্ডে থেকে জাগুয়ার বন্দুক চলে এসেছে । অ্যামাজনে শিকার করার জন্য ভালো কিছু রাখা উচিত । এই শিকার করা , দারুন একটা খেলা । ”

“সেরা খেলা এই বিশ্বে ” রেইন্সফোর্ডও সম্মতি দিলো ।

“শিকারের জন্য কিন্তু জাগুয়ার এর জন্য না ” হুইটনি শুধরিয়ে বললো ।

“বাজে কথা বলো না , হুইটনি ” রেইন্সফোর্ড বললো । “আপনি অনেক বড় মাপের শিকারি , কিন্তু দার্শনিক না । জাগুয়ার কেমন এতো কিছু কে চিন্তা করে ? ”

“হতে পারে জাগুয়ার নিজেই করে ” হুইটনি বললো ।

” বাহ্‌ !! তাদের তো বোধ শক্তিই নেই । ”

” তবুও ! আমি বরং জানি তাদের এক জিনিষ ভালো বুঝতে পারে — ভয় । ব্যাথা পাওয়ার ভয় , মৃত্যুর ভয় । ”

” আজে বাজে কথা ” রেইন্সফোর্ড হাসতে হাসতে বললো । এই উষ্ণ আবহাওয়া আপনাকে অনেক নরম করে দিচ্ছে হুইটনি । বাস্তববাদী হোন । এই পৃথিবীতে কেবল দুই ধরণের শ্রেণী আছে – শিকারিদের , আর যারা শিকার হবে । ভাগ্য ভালো , আপনি আর আমি শিকারি । আপনি কি মনে করেন , আমরা আইল্যান্ড পার হয়ে গিয়েছি ? ”

“অন্ধকারে কিছুই বলতে পারবো না , তবে মনে হয় ”

“কেন ?” রেইন্সফোর্ড জিজ্ঞেস করলো ।

” এই জায়গাটা এক খারাপ জিনিষের জন্য বিখ্যাত । ”

“ক্যানিবেলস মানে নরখাদক ? ” রেইন্সফোর্ড বললো ।

“হয় নি । ” যদিও নরখাদক এই কঠিন জায়গায় টিকে থাকতে পারবে না । কিন্তু নাবিকরা এই জায়গা এক ভাবে পেয়ে গিয়েছে । আপনি কি খেয়াল করেন নি , আজকে নাবিকদলরা একটু ছটফটের মধ্যে আছে ? ”

“হ্যাঁ , ঐ সুইডেনের কঠিন মনের লোকটাও , যারা শয়তানকে দেখতে চায় , তার কাছে গেলেই হয় । যে ঠাণ্ডা নীল রঙের চোখ!! আমি আগে কখনও দেখি নি । আমি তাঁর কাছে থেকে জা শুনেছি তা হলো , সমুদ্রের ভ্রমণকারিদের কাছে এই জায়গার একটি নাম আছে , স্যার । তারপর তিনি গম্ভীরভাবে বললো , “আপনি কি কিছুই টের পাচ্ছেন না ? — মনে হচ্ছে বাতাস অনেক ভারি হয়ে উঠছে । এখন , আমার কথা শুনে  আপনি হাসবেন না — আমি সত্যিই একরকম ঠাণ্ডা অনুভব করলাম । ”

“সেইখানে কোন বাতাস নেই । সমদ্রু একদম কাঁচের জানালার মতন ফ্ল্যাট হয়ে ছিলো । আমরা তখন আইল্যান্ডের কাছে ছিলাম । চারিদিকে আমি ঠাণ্ডা পরিবেশ অনুভব করলাম । হঠাৎ , এক ধরণের ভয় কাজ করতে লাগলো । ”

“ভালো গল্প ” রেইন্সফোর্ড বললো ।

“এক কুসংস্কারাচ্ছন্ন নাবিকের ভয়ের জন্য সঙ্গে পুরো জাহাজ কোম্পানি কলুষিত হয়ে যেতে পারে ”

” হতে পারে । কিন্তু আমি মনে করি , নাবিকদের একটা বাড়তি সেন্স থাকে যাতে তারা বলতে পারে , সামনে তাদের কোন বিপদ আছে কি না । মাঝে মাঝে আমার মনে হয় , অশুভ জিনিসটা বাস্তব ব্যাপার । — বিশাল বিশাল ঢেউ , সাথে বজ্রপাত , গর্জন । ” খারাপ জায়গাতেও বলতে গেলে , এই ধরণের ইঙ্গিত থাকে । যেকোনো ভাবেই হোক , আমি খুশী , আমরা সেই জায়গা থেকে চলে এসেছি । আচ্ছা , এখন মনে হয় আমার চলে যাওয়া উচিত , রেইন্সফোর্ড । ”

“আমার এখনো ঘুম আসে নি , ” রেইন্সফোর্ড বললো । ” আমি আরেকটা সিগারেট ধরবো । ”

“তাহলে শুভরাত্রি , রেইন্সফোর্ড । সকালে নাস্তার সময় দেখা হবে । ”

“ঠিক আছে , শুভরাত্রি । হুইটনি ”

রেইন্সফোর্ড বসে আছে । সেই রাতে কোন শব্দ নেই । কিন্তু ইঞ্জিনের চাপা ঘূর্ণন শব্দ , নৌকাকে অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে ।

রেইন্সফোর্ড স্টিমার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে । ঘুম ঘুম চোখে সিগারেট টেনেই চলছে । সেই চোখের সামনে কালো রাত । “অনেক অন্ধকার ” সেই ভাবলো । ” যদি রাত আমার চোখের পাতা হতো তাহলে চোখ বন্ধ ছাড়াই ঘুমাতে পারতাম …”

হঠাৎ এক শব্দ থাকে চমকিয়ে তোলে । ডানদিক থেকে কানে আওয়াজটা এসেছে , এই ধরণের বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞ , ভুল হতে পারে না । আবার শব্দটা শুনলো , আবার !! কেউ অন্ধকারে আছে , কেউ অন্ধকারে তিনবার গুলি করেছে ।

রেইন্সফোর্ড সোজা লাফ দিয়ে উঠে পড়লো । আশ্চর্য হয়ে গেলো । চোখ মেলে তাকালো যেখান থেকে আওয়াজটা আসছিলো । কিন্ত এতো অন্ধকার , মনে হচ্ছে কম্বলের মধ্য দিয়ে তাকাচ্ছে । রেলের উপর ব্যাল্যান্স করে দাঁড়ালো । দড়ির আগাতে তাঁর মুখ থেকে সিগারেট পড়ে গেলো । পা থেকে ব্যাল্যান্স সরতেই মুখ থেকে চাপা কান্না বের হলো ।

সে ব্যাথায় মাটিতে গড়াগড়ি করছে , ব্যাথায় চিৎকার করতে চাচ্ছে । কিন্তু নৌকার ধোঁয়া তাঁর মুখের উপর পড়ে চোখ মুখ অন্ধকার করে দিলো । অন্যদিকে এক ঝটকা সমুদ্রের লবন পানি তাঁর গলায় ঢুকে শ্বাসরোধ করে দিলো । আলো কমে যাওয়ার কারনে নৌকায় সে ক্রমাগত বাড়ি খেতে খেতে অবশেষে পঞ্চাশ ফিট দূরে গিয়ে পড়লো । পুরো শরীর মনে হয় অবশ হয়ে যাচ্ছে । এইটাই প্রথম বার না যে সে এই জায়গায় এসেছে ।  নৌকা থেকে বাইরে কেউ হয়তো তাঁর চিৎকার শুনতে পারতো , কিন্তু নৌকার গতির কারনে সেই সুযোগ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়লো । সে নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে চিৎকার করলো । নৌকার আলো আরও কমে যাচ্ছে , এমনকি জোনাকি পোকার আলোগুলোও ।

রেইন্সফোর্ড শব্দের কথা মনে করলো । সেই আওয়াজগুলো ডান দিক থেকে এসেছে । সেই ওইদিকে সাতার কেটে এগোতে লাগলো । আস্তে আস্তে এগোতে থাকলো যাতে শক্তি কম ক্ষয় হয় । সে অনেক্ষন ধরে সাগরে যুদ্ধ করতে হচ্ছে , পড়ে তাঁর সাতারের খাবির সংখ্যা গুনতে শুরু করলো । প্রায়ই – একশ এর উপর হয়ে গিয়েছে ।

রেইন্সফোর্ড এক শব্দ শুনতে পেলো । এটি অন্ধকার ভেদ করে আসছে , চিৎকারের শব্দ – জানোয়ারদের ভয়ার্ত চিৎকার , যন্ত্রণার আর্তনাদ ।

সেই আওয়াজগুলো শুনে বুঝতে পারলো না এইগুলো কাদের শব্দ , চেষ্টাও করলো না । বরং আরও শক্তি দিয়ে সে শব্দের দিকে সাঁতড়িয়ে এগোতে থাকলো । আবার শব্দ কানে এলো । তারপর ,মাঝখানে আরেকটি শব্দ প্রবেশ করলো ।
“পিস্তল শট ” , রেইন্সফোর্ড বিড়বিড় করে বললো ।

দশ মিনিট পরে আরেকটি শব্দ ! পাথরের সৈকতে সমুদ্রের গর্জন চারিদিকে । তীরে প্রায় চলে এসেছে । অশান্ত রাতটিতে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে । অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে তাকে সে নিজেকে তীরে নিয়ে আসলো । খাঁজ খাঁজ পাথরের পর্বত তাঁর পায়ের সামনে পড়লো । সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হামাগুড়ি দিয়ে চলতে চলতে সেগুলো পার হয়ে সমতল জায়গায় পৌছালো । পর্বত পার হতেই এক ঘন জঙ্গল সামনে পেলো । দানব আকৃতির গাছপালার , ঝোপঝাড় দেখে তাঁর মনের মধ্যে ভয় প্রবেশ করলো । কিন্তু সে জানে তাঁর শত্রু সাগর থেকে থেকে অনেক দূরে। ক্লান্তিতে শরীর অবশন্ন হয়ে পড়ছে । জঙ্গলে ধারে কাছে নিজে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লো ।

চোখ খুলতে দেখলো , বিকেল হয়ে গেছে । ঘুমানোর পর কিছুটা আরাম লাগছে । কিন্তু ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে । এখন সে এখন নিজেকে খোঁজা শুরু করলো ।

“কোথায় বন্দুকের গুলি , কোথায় মানুষ । এইখানেই মানুষজন কোথায় , খাবার কোথায় ” , সে চিন্তা করতে থাকলো । কি ধরণের মানুষই বা এইখানে থাকতে পারে ? কেনই বা এতো নির্জন জায়গা ? তীরের সামনে কতো বিশাল জঙ্গল !!

গাছ পালা , ঘাস আগাছা দিয়ে চলার সময় লক্ষ্য করলো সেইখানে কোন পায়ের চিহ্ন নেয় । তীর বরাবর চলা কোন কঠিন ব্যাপার ছিল না । একটু দূরে যেয়েই থামে গেলো ।

এক বিশাল আহত জন্তুর প্রতি তাঁর দৃষ্টি গেলো , ঝোপের মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে । জঙ্গলে ঝোপ ঝাড় সেইখানে পিষ্ট হয়ে আছে , শৈবাল জন্মেছে । এক টুকরো আগাছায় রক্তের দাগ ছিল । অল্প দুরেই চকমক করতে থাকা এক জিনিষের প্রতি চোখ গেলো । সে তুলে নিয়ে দেখলো খালি কার্তুজ ।

” A twenty two । ” সে লক্ষ্য করলো । “বড়ই অদ্ভুত । বড় কোন জানোয়ারকে শিকার করার জন্য যথেষ্ট । এতো হাল্কা বন্দুক নিয়ে শিকার করাটা সহজ কথা না ; শিকারির সাহস আছে বলতে হবে । পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে , এই পশুর সাথে মারামারি হয়েছে । আমার অনুমান হচ্ছে , প্রথম তিনটা গুলি আমি শুনেছিলাম তা মনে হয় এখান থেকে । এই শিকারি শিকার করার জন্য গুলি করেছে । পড়ে আহত অবস্থায় এটি পড়ে আছে । শেষ শুটে সে এতোটুকু এসেছিলো , এখানেই শেষ । ”

সে আশপাশ ভালো করে দেখতে লাগলো , অবশেষে যেটা মনে মনে খুঁজছিলো তাই পেলো , শিকার বুটের চিহ্ন । চিহ্নগুলো পর্বত বরাবর চলে গেছে , সেও সোজা চলতে লাগলো । দ্রুত হেঁটে যাওয়ার সময় একবার এক পাথরের সাথে ধাক্কা লেগে পিছলে গিয়েছিলো , কিন্তু এগিয়ে যেতে থাকলো । এই আইল্যান্ডে রাত হয়ে পড়লো ।

আলো চোখে পড়ার সাথে সাথে জঙ্গল , সমুদ্রের অন্ধকার দূরে চলে গেলো । সে দ্বীপে চলে আসলো , একটু চারদিকে ঘুরে তাকালো । এক জায়গা থেকে আলো আসছে ।প্রথমে সে এটিকে গ্রাম ভেবছিলো , কারণ অনেক আলো আসছিলো । কিন্তু এক বিশাল দালান থেকে এতো আলো আসছে দেখে সে অবাক হয়ে গেলো , সামনে দিকে এগিয়ে গেলো সে । দালানটি অনেকটা টাওয়ারের মতন দেখতে , উপরের দিকে ক্রমেই সরু হয়ে গেছে । মনে মনে সে ভাবলো এটি দুর্গ হতে পারে । অনেক সুকৌশলেই এটি বানানো হয়েছে । এটির তিনদিকেই বাঁধ , নিচে পৌঁছে সমুদ্রের সাথে মিশে গিয়েছে ,সেখানে সমুদ্রের রাক্ষসী ঢেউগুলো দানা বেঁধে ধারে অবিরত চুম্বন দিয়ে যাচ্ছে ।

“মরীচিকা !!” রেইন্সফোর্ড ভাবলো । কিন্তু এটি কোন মরীচিকা না , সে লম্বা কাঁটাযুক্ত গেইট খুলে পা বাড়ালো । মাটিতে পাথরগুলোর গাঁথায় অনেক ভালো হয়েছে । বিশাল দরজার উপর চিহ্নিত সিংহ আগন্তুকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আছে । চারিদিকে এক অশরীরী অবস্থা মনে হচ্ছে ।

সে দরজার কড়া তুললো । কড়াটা শক্ত , ক্যাঁচক্যাঁচ করে উঠলো । মনে হচ্ছে যেনো , অনেকদিন ব্যবহার করা হয় নি । সে কড়াটা হাত থেকে ছেড়ে দিলো । দরজার সাথে বাড়ি খেয়ে বুম্‌ করে আওয়াজে সে ভয় পেয়ে গেলো । । সে মনে করিছলো , ভিতরে পায়ের আওয়াজ শুনবে , কিন্তু দরজা বন্ধই ছিলো । রেইন্সফোর্ড আবার ভারি কড়াটা তুলে হাত থেকে ছেড়ে দিলো । তারপর দরজা খুলে গেলো । এমনভাবে দরজা খোলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে , এটি স্প্রিঙের দরজা । দরজার খোলার সাথে সাথে নদীর পানি থেকে স্বর্নালী জ্যোতি তাঁর চোখের উপর পড়ায় চোখ পিট পিট করে তাকালো । দরজা খুলেতেই , এক বিশালদেহী মানুষ রেইন্সফোর্ডের চোখে পড়লো । কালো কালো দাঁড়ি কোমর পর্যন্ত ঝুলে আছে , এতো শক্ত সামর্থ দানবাকৃতির প্রাণী জীবনের এইত প্রথম সে দেখেছে । তাঁর হাতে লম্বা পাইপওয়ালা রিভাল্ভার , একদম সোজা রেইন্সফোর্ডের বুকের দিকে তাক করে রেখেছে ।

দাঁড়িগুলোর বাইরে চোখ দুটো দিয়ে রেইন্সফোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে ।

“অস্থির হবেন না , ” রেইন্সফোর্ডের নিরীহ এক হাসির সাথে বললো । “আমি ডাকাত না । আমি নৌকা থেকে পড়ে গেছি । আমার নাম স্যাঙ্গার রেইন্সফোর্ড , নিউ ইয়র্ক থেকে এসেছি । “—–

রক্তমাখা চোখের কোন পরিবর্তন হলো না । মূর্তির মতন করে রিভাল্ভার শক্ত করে তাক করে রেখেছে । মনে হচ্ছে রেইন্সফোর্ডের কথা বুঝতে পারছে না , আর নয়তো শুনতে পাচ্ছে না । তাঁর পড়নে , কালো ইউনিফর্মের উপর ধুসর চামড়ার জ্যাকেট (অ্যাস্ট্র্যাক্যান্ ) ।

” আমি স্যাঙ্গার রেইন্সফোর্ড , নিউ ইয়র্ক থেকে এসেছি ” রেইন্সফোর্ডের বার বার বললো । “আমি নৌকা থেকে পড়ে গেছি , আমি অনেক ক্ষুধার্ত । ”

উত্তরে কেবল লোকটি সেইভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলো । তারপর , রেইন্সফোর্ড দেখলো , তাঁর এক হাত দিয়ে মিলিটারি স্যালুটের মতন কপালে হাত দিলো , দু পা একসাথে করে , এটেনশন দেবার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেলো । আরেকজন মার্বেলে পাথরের মেঝের উপর দিয়ে আসছে ,দেখতে লম্বা , চিকন । পড়নে সাধারণ পোশাক । রেইন্সফোর্ডের দিকে এগিয়ে , হাত বাড়িয়ে দিলো ।

উন্নত স্বরে সে বললো ,অনেক আনন্দের ব্যাপার , বিখ্যাত শিকারি , রেইন্সফোর্ডকে আমার ঘরে আমন্ত্রন জানাতে সম্মান বোধ করছি ।

কিছু না ভেবেই রেইন্সফোর্ড হাত মিলালো ।

“আমি আপনার লেখা তিব্বতের তুষারে চিতাবাঘের শিকার সম্পর্কে বইটি পড়েছি । ” লোকটি ব্যাখ্যা করলো । “আমি জেনারেল জ্যারফ । ”

তাঁকে দেখে রেইন্সফোর্ডের অনেক সুদর্শন মনে হলো । কিন্তু তাঁর পরের জন অনেকটাই সাধারণ , অদ্ভুত ধরণের কিছু গুন জেনারেলের চেহারায় । সে দেখতে বয়স্ক , লম্বা । চুলগুলো একদম সাদা , মোটা ভুরু । চোখগুলো কালো , উজ্জ্বল । প্রশস্ত গাল ,খাড়া নাক , রুক্ষ চেহারা , মনে হচ্ছে কেবল অর্ডার দেয় । দানবাকৃতির ইউনিফর্ম পড়া লোকটির দিকে তাকিয়ে ইশারা দিলো ।
সে পিস্তল সরিয়ে নিয়ে স্যালুট দিলো ।

“ইভান অনেক ভালো অনুসারী ছিলো । ” জেনারেল তাঁর দিকে তাকিয়ে বললো “কিন্তু তাঁর দুর্ভাগ্য কানে কথা শুনতে পারে না , কথা বলতে পারে না । অনেক সাধারণ অনুসারী , কিন্ত অন্য সবার মতন আমিও একটু ভীত , অনেকটা খুনির মতন দেখতে । ”

“তিনি কি রুশ ”

” সে কশাকিয়ান ” জেনারেল হাসতে হাসতে বললো , “আমিও”

“এখানে আসেন ,” সে বললো । “আমাদের এইখানে কথা বলা ঠিক না , আমরা পরে কথা বলবো । এখন আপনার কাপড় , খাবার , বিশ্রামের প্রয়োজন । আপনি তা পাবেন । বিশ্রাম নেয়ার জন্য ভালো একটি জায়গা । ”

ইভান আবার আসলো । জেনারেল তাঁর দিকে মুখ নাড়িয়ে কথা বললেন , কিন্তু কোন আওয়াজ বের হলো না ।

” কষ্ট করে ইভানকে অনুসরণ করেন , মিস্টার রেইন্সফোর্ড । ” ” আপনি যখন এসেছেন আপমি তখন খেতে যাচ্ছিলাম । আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করবো । আমার মনে হয় , কাপড় আপনারসব ফিট হবে । ”

রেইন্সফোর্ড ওই দানবকে অনুসরণ করতে করতে শয়নকক্ষে গেলো । বিম তৈরি ছাদের বিশাল শয়নকক্ষ , অনেক বড় বিছানা , সাথে আছে শামিয়ানা , ছয় জন এক সাথে ঘুমাতে পারবে । ইভান তাঁর পড়ার জন্য কাপড় বের করে দিলো । রেইন্সফোর্ড কাপড়ের সেলাই দেখে বুঝতে পারলো সেটি লন্ডন থেকে আনা হয়েছে , মসৃনভাবে সেলাই করা , অভিজাত সম্প্রদায় ছাড়া তারা কারোর জন্য সেলাই করে না ।

ইভান তাঁকে যে খাবারঘরে নিয়ে গেলো তা আরও চমৎকার , মধ্যযুগীয় আভিজাত্যের ছোঁয়া সব জায়গায় , পুরো ঘরটা ব্যারনিয়াল হলের মতন দেখতে , অনেক উঁচু ছাদ ।ওক গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি চারপাশ । বড় বড় খাবার টেবিল , এক সাথে চল্লিশ জন বসতে পারবে । হলের উপরে বিভিন্ন রকমের প্রাণীর মূর্তি , সিংহ, বাঘ, হাতি, আমেরিকার হরিণবিশেষ, ভালুক । এতো বিশাল বিশাল ভাস্কর্য আগে কখনো দেখে নি সে । আর বড় টেবিলে জেনারেল একা বসে আছে ।

“আপনাকে ককটেল খাওয়ানো হবে , মিঃ রেইন্সফোর্ড । ” সে বললো । ককটেলটা দারুন ছিলো । রেইন্সফোর্ড খেয়াল করলো , টেবিলে চীনের লিনেন, ক্রিস্টাল , সিল্ভারের উপকরণ দিয়ে সাজানো হয়েছে । ”

তারা সবাই সুপ খাচ্ছে , ক্রিম মেশানো রাশিয়ান রেড সুপ । ক্ষমা চেয়ে জেনারেল জ্যারফ বললেন ” আমরা মানুষদের জন্য যতটুকু সম্ভব সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করি ,। যদি ভুল হয় ক্ষমা করে দিবেন । আমরা এইখানে কষ্টের মধ্যে থাকি , আপনি তা জানেন । আমি কি মনে করেন , দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার কারনে শ্যাম্পেন কোন ধরনের ক্ষতি করছে ?”

“মোটেই না । ” রেইন্সফোর্ড বললেন । তিনি দেখলেন জেনারেল অনেক দয়ালু , চিন্তাশীল ব্যাক্তি , একজন সত্যিকারের কসমোপলাইট । কিন্তু একটি ব্যাপার চোখে পড়লো , যেটি রেইন্সফোর্ডকে কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিলো । দেখলো , সে যখন খাচ্ছে , জেনারেল ভালো করে তা লক্ষ্য করছে , একটু সঙ্কীর্ণভাবে তাকাচ্ছে ।

“সম্ভবত” জেনারেল জ্যারফ বললেন । “আপনি অবাক হবেন , আমি আপনার নাম চিনতে পেরেছি । আপনি দেখেছেন , আমি আপনার শিকারের উপর বইগুলো পড়েছি , ইংরেজি, ফ্র্যাঞ্চ , রাশিয়ান । আমার জীবনে একটা মাত্র শখ বাকি , মিঃ রেইন্সফোর্ড , আর সেটা হলো শিকার । ”

“আপনার দিন দারুনসব ঘটনা আছে এইখানে , ” রেইন্সফোর্ড ফিলেট মিগনোন খেতে খেতে বললো , এতো বড়ো মহিশের মাংস আমি জীবনে এই প্রথম দেখলাম । ”

” আহ্‌ ,বন্ধু । হ্যাঁ , অনেক বড় ছিলো , দানবের মতন ”

“আপনাকে কি সে তাড়া করেছিলো ?”

” একদম জোরে গাছের মধ্যে বাড়ি মেরেছে ” জেনারেল বললো । “আমার মাথাটা ফাটিয়ে দিয়েছে , কিন্তু আমি সেই পশুটাকে পেয়েছি ”

“আমি এক ব্যাপার চিন্তা করি , ” মিঃ রেইন্সফোর্ড ” বড় মহিষ গুলো অনেক বিপজ্জনক ”

কিছুক্ষনের জন্য জেনারেল কোন উত্তর দেয় নি , ঠোঁট প্রসারিত করে একটু হাসলেন । তারপর তিনি বললেন , “না , আপনি ঠিক বলেন নি , স্যার । দামড়া মহিসগুলো মোটেই ঝুঁকিপূর্ণ না ।” মদে চুমুক দিতে দিতে বললেন । ” এই আমার সংরিক্ষিত জায়গায় , আমি অনেক বিপজ্জনক খেলা শিকার করি । ” সে একই সুরে বললেন ।

রেইন্সফোর্ড আশ্চর্য হয়ে বললেন , “এইখানে এর চেয়ে বড় শিকার আছে ?”

জেনারেল মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলেন , “সবচেয়ে বড় ”

“সত্যি ?”

“আহা , এইটাই তো স্বাভাবিক , তাইতো আমি এই জায়গায় সংরক্ষন করেছি । ”

“আপনি কি আনেন , জেনারেল ? “রেইন্সফোর্ড জিজ্ঞেস করলো , “বাঘ ? ”

জেনারেল হাসি দিয়ে বললো , ‘না ‘ সে বললো , ” বাঘ শিকার করার শখ কয়েক বছর আগে চলে গেছে । আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি , কোন বিপদ নেই সেইখানে , তাই কোন মজা পাই না , আমি ঝুঁকি নিতে ভালবাসি , মিঃ রেইন্সফোর্ড ‘

জেনারেল গোল্ড সিগারেট পকেট থেকে বের করলেন , তাঁর অতিথিকেও একটা দিলেন , ধোঁয়াতে ভারি একটা গন্ধ বের হলো ।

“আমাদের বড় একটা শিকার আছে , আপনার এবং আমার ” জেনারেল বললেন । ” আমি অনেক খুশী হবো যদি আপনি আমার সাথে থাকেন ”

“কিন্তু কি ধরণের শিকার —” রেইন্সফোর্ড শুরু করলেন ।

“আমি বলবো ” জেনারেল উত্তর দিলেন । “আপনি অনেক খুশী হবেন , আমি জানি । আমি বিনয়ের সাথে বলতে পারি , কিছুটা দুষ্প্রাপ্য কিছু করেছি । আমি নতুন এক আনন্দ বের করেছি । আরেক গ্লাস দিবো নাকি ? ”

“ধন্যবাদ , জেনারেল ”

জেনারেল দুই গ্লাসে মদ ঢাললেন , এবং বললেন , ” গড কিছু পুরুষ কবি তৈরি করেছেন , কিছু মানুষকে তিনি রাজা বানিয়েছেন , কিছু মানুষকে ভিখারি । আমাকে , তিনি শিকারি বানিয়েছেন । আমার বাবা বলতেন , আমার হাত নাকি ট্রিগার ধরার জন্য বানানো হয়েছে । তিনি অনেক বড় লোক ছিলেন , ক্রিমিয়াতে তাঁর প্রায় এক লক্ষ একর জমি ছিলও , খেলতে ভালোবাসতেন । আমার যখন পাঁচ বছর তিনি আমাকে ছোট বন্দুক দিয়েছিলেন , মস্কোর তৈরি ছিল সেটি । চড়ুই পাখি মেরেছিলাম । যখন তাঁর পুরুষকার টার্কি মেরেছিলাম , তিনি আমাকে মারেন নি , কিন্তু আমার লক্ষ্যভেদের জন্য প্রশংসা করেছেন । যখন আমার বয়স দশ বছর , আমি ককেশাসে ভালুক শিকার করেছি । আমার জীবনে একবার শুধু দীর্ঘ শিকারের ভ্রমন ছিল । পরে আমি আর্মিতে ঢুকি , ভালো মানুষের সন্তান হবার আশায় । একবার কশাকে অশ্বারোহী সেনাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলাম , কিন্তু শিকার করার নেশা কোনদিন আমার যাই নি । প্রত্যেক জায়গায় আমি শিকার করি । আমার পক্ষে বলা অসম্ভব আমি কতগুলো পশু মেরেছি । ”
জেনারেল সিগারেটে এক লম্বা টান দিলেন ।

“রাশিয়াতে বিপর্যয়ের পরে , আমি দেশ ছেড়ে চলে যাই । কারণ সেইখানে থাকাটা ঠিক ছিল না । অনেক ধনী রাশিয়ান , অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছে । আমার ভাগ্য ভালো যে , অ্যামিরিকান সিকিরিউটির জন্য আমি অনেক টাকা ঢেলেছিলাম । তাই আমাকে মন্টে কার্লোতে চায়ের দোকান খুলতে হয় নি , গাড়ির ড্রাইভারও হতে হয় নি । আমি স্বাভাবিক ভাবেই আপনাদের ওইদিকে হরিন শিকার করতাম , , গঙ্গায় কুমির , পূর্ব আফ্রিকায় গন্ডার মারতাম । আফ্রিকায় বলদা মহিষ আমাকে আক্রমণ করেছিল , প্রায় ছয় মাস বিছানায় পড়ে ছিলাম । সুস্থ হয়েই এমাজনে জাগুয়ার শিকার করতে গিয়েছিলাম । আমি শুনেছিলাম তারা অনেক ধূর্ত । কিন্তু তাড়া সেটা না । ” কসাক সৈনিক দীর্ঘশ্বাস নিলেন । ” শিকারী বুদ্ধির সাথে তাদের বুদ্ধির কোন মিল নেই । আমার প্রচণ্ড মাথা ব্যাথায় আমি ঘুমিয়ে ছিলাম , এক ভয়ানক চিন্তা আমাকে গ্রাস করে ফেললো । শিকার করা আমার কাছে বিরক্তকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো । শিকার করাই আমার জীবন ছিলো , আমি শুনেছি , অ্যামেরিকার ব্যাবসায়ীরা যখন ব্যবসা ছেড়ে দেয় তারা পড়ে শিকারে যায় । ”

“হ্যাঁ , তা ঠিক” রেইন্সফোর্ড বললেন ।

জেনারেল হাসতে হাসতে বললো , “আমার সেইরকম কোন ইচ্ছা নেই । ” তারাও বললেন , “আমি কিছু একটা অবশ্যই করবেন , আমার মন কিছুটা বিশ্লেষণধর্মী , মিঃ রেইন্সফোর্ড , নিঃসন্দেহে , আমি কোন কিছুর প্রতি ছুটতে ভালো লাগে । ”

“কোন সন্দেহ নেই , জেনারেল জ্যারফ ”

“তাই , ” জেনারেল বলতে শুরু করলেন , ” আমি মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করতাম , কেন শিকার করাটা আমাকে আকর্ষণ করে না । আপনি আমার চেয়ে অনেক ছোট । মিঃ রেইন্সফোর্ড । আমি বেশি কিছু শিকার করি নাই , কিন্তু আমার মনে হয় আপনি উত্তরটি জানেন ।”

“কোনটা ?”

“এইটাই ; আমারে শিকার করা নেশা উঠে গেছে । সেটাকে খেলা বলা হয় । এটি আমার জন্য অনেক সোজা ছিল । অনেক মজা পেতাম , কোনদিন বিরক্ত হয় নি । ”

জেনারেল নতুন আরেকটা সিগারেট জ্বালালেন ।

“কোন প্রাণীই আমার সাথে পেরে উঠতো না । বড়াই করার বিষয় না । সাধারণ অঙ্কের হিসাব । তাদের পা আর অনুভূতি ছাড়া আর কিছুই নেই । প্রবৃত্তি কোন কারণ খুঁজে না । যখন আমি এই ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম , আমার জন্য এটি অনেক কঠিন মুহূর্ত ছিলো । আমি আপনাকে তা বলতে পারি । ”

রেইন্সফোর্ড মাথা এগিয়ে নিলো , মনোযোগ দিয়ে শুনছে জেনারেল যা বলছে ।

“এটি আমার কাছে অনেক অনুপ্রেরণার ব্যাপার , যা আমি অবশ্যই করি । ” জেনারেল বলা শুরু করলো /

“আর , এটি সেটাই ?”

জেনারেল মৃদু হাসি দিয়ে বললো , “আমাকে এক নতুন প্রাণী শিকার করতে হয়েছিলো ”

“নতুন প্রাণী ? আপনি কি মজা করছেন ?”

“মোটেই না । ” জেনারেল উত্তর দিলো । “আমি শিকার নিয়ে মোটেই মজা করি না । আমার নতুন এক প্রাণীর দরকার ছিল । তাই আমি এই আইল্যান্ড কিনি , আর বাড়ি বানাই । এইখানে আমি শুধু শিকার করি । আইল্যান্ডটা একদম ঠিক আমার জন্য । কিন্তু জঙ্গলের রাস্তা অনেক কঠিন , পর্বত , বিল অনেক কিছু আছে । ”

“কিন্তু পশু , জেনারেল জ্যারফ ?”

“অহ” জেনারেল উত্তর দিলেন । ” এটি আমার কাছে শিকারের জন্য সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে । অন্য কোন শিকারের সাথে তুলনা করা ঠিক হবে না । আমি প্রতিদিন শিকার করি , কোনদিন বিরক্ত লাগে না । আমার এক শিকার আছে , যেটা দিয়ে আমি এই ব্যাপারটা মিলাতে পারবো । ”

রেইন্সফোর্ড অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো ।

“আমার মনের মতন একটা পশু দরকার । ” জেনারেল ব্যাখ্যা করলেন । ” কি ধরণের গুন থাকা দরকার সেই পশুগুলোর মধ্যে ? অবশ্যই , পশুর মধ্যে সাহস থাকতে হবে , বুদ্ধি থাকতে হবে , সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো কোন কিছু বুঝতে পারতে হবে । ”

“কিন্তু কোন প্রাণীর তো বুদ্ধি নেই ” রেইন্সফোর্ড আপত্তি করলেন ।

“”আমার বন্ধু । সেইখানে একটি আছে , যার বুদ্ধি আছে । ” জেনারেল বললেন ।

” কিত্নু আপনি এতো নীচ হতে পারেন না ” রেইন্সফোর্ড হাঁ করে রইলো ।

“কেন না ?”

“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না , আপনি সিরিয়াস , জেনারেল জ্যারফ , মনে হয় পুরাটাই তামাশা । ”

“আমি কেন সিরিয়াস হব না ? আমি শিকারের ব্যাপারে কথা বলছি । ”

“শিকার ? বড় বন্দুক , জেনারেল , আপনি তো খুনের ব্যাপারে কথা বলছেন ।”

জেনারেল হা হা করে হাসলেন । তিনি বললেন “আমি মনে হয় না , আপনার মতন আধুনিক , সভ্য মানুষ মানুষদের জীবন নিয়ে রোমান্টিক ভাবনা পোষণ করেন । নিঃসন্দেহে , আপনার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে — ”

“সেটি আমাকে ঠাণ্ডা মাথার খুনি করে নি , ” রেইন্সফোর্ড কঠিন ভাবে উত্তর দিলেন ।

জেনারেল আবারো হাসলেন । ” আপনি অনেক মজার লোক !! ” আজকাল কেউ আশা করে না , একজন সুশিক্ষিত যুবক এতো সহজ সরল হবে , এমনকি অ্যামেরিকাতেও । আমি যদি মিড ভিক্টোরিয়ান দের মতন বলতে গেলে , এই যেন প্রাসাদে সিন্দুকে থাকা চমকানো হীরা । আহ্‌ , ভালো তো , আপনার পূর্বপুরুষরা অনেক ভালো ছিলেন । অনেক অ্যামেরেকান আছে এই রকম । কিন্তু আমি বাজি দিয়ে বলতে পারি , আপনি যখন শিকারে যাবেন , আপনি ধারণা ভুলে যাবেন । আপনি অণ্য রকম , জনাব রেইন্সফোর্ড বললেন ।

“ধন্যবাদ আপনাকে , আমি শিকারি , খুনি না ”

“ভাই , ” জেনারেল বললেন । কিছুটা গম্ভীরভাবে । আবারও শুনলে খারাপ লাগতে পারে , আপনার ধারণা পুরাই অমূলক ।

“জি ? ”

“জীবনটা শক্তিশালীদের জন্য , শক্তিশালীদের পাশে থাকার জন্য । যদি দরকার হয় ,শক্তিশালীদেরকে কাছে টানতে হবে । এই পৃথিবীতে দুর্বলদের জায়গা কেবল পাশবিক আনন্দ দেয়ার জন্য । আমি শক্তিশালী । আমি কেন এই উপহার ব্যবহার করবো না ? আমি যদি শিকার করতে চাই , তাহলে কেন করবো না ? আমি পৃথিবীর সবজায়গায় শিকার করেছি । জাহাজে থাকা – লাসারস, কৃশাঙ্গ , চীনা, শ্বেতাঙ্গ , মোঙ্গলিজ , ঘোড়া , শিকারী কুকুর । ”

“কিন্তু তারা মানুষ ” রেইন্সফোর্ড গরম হয়ে গেলো ।

“একদম ঠিক ‘ জেনারেল বললো । “তাই আমি তাদেরকে ব্যবহার করেছি । কারণ এতে আমি আনন্দ পাই । ভেল পালটানোর পর , তাদের বুদ্ধি থাকতে পারে , কিন্তু তারা অনেক মারাত্মক ।”

“কিন্তু আপনি তাদেরকে কিভাবে পান ?”

জেনারেল চোখ টিপলো । ” এই আইল্যান্ডকে শিপ ট্র্যাপ বলা হয় । ” তিনি বললেন । ” মাঝে মাঝে রুষ্ট গড তাদেরকে আমার কাছে পাঠান । অনেক সময় তদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকে না । আমার সাথে জানালার কাছে চলেন । ”

রেইন্সফোর্ড জানালার কাছে গিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকালেন ।

“দেখেন , ওইখানে ” রাতে অন্ধকারের দিকে ইশারা দিয়ে জেনারেল বললেন । রেইন্সফোর্ড পুরাটাই অন্ধকার দেখলো । জেনারেল সুইচ অন করলো , রেইন্সফোর্ড অনেক দূরে সমুদ্রের বাতি দেখলো ।

জেনারেল মুখ টিপে হাসলেন । “সেইগুলো নদীর চ্যানেল । ” বিশাল বিশাল শিলাগুলো দেখছেন , সমুদ্রদানবের মতন হাঁ করে আছে , তারা যে কোন জাহাজকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে পারে , যেইভাবে আমি এই বাদামটা ভাঙলাম । তিনি এক আখরোটকে কাঠের ফ্লোরে রেখে , পায়ে পড়া হিলের জুতা দিয়ে গুড়া করে ফেললেন । “আহ , হ্যাঁ , আমাদের এইখানে বিদ্যুৎ আছে , আমরা এইখানে সভ্য হবার চেষ্টা করি । ”

“সভ্য ? আপনি কি মানুষদেরকে মেরে ফেলেন ? ”

একটা রাগের ছায়া জেনারেলের কালো চোখে দেখা গেলো । কিন্তু তা এক সেকেন্ডের জন্য । ভদ্র ভাবে বললেন , “ভাই , আপনি কতো ভালো লোক !! আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি , আপনি যা করতে বলবেন না , আমি তা করবো না । এইটা নিষ্ঠুর দেখাতো । আমি অতিথিদেরকে অনেক গুরুত্ব দিয়ে আপ্যায়ন করি । তাদের জন্য এইখানে প্রচুর খাবার আছে , বিশ্রামের জায়গা আছে । আমি আপনাকে কালকে দেখাবো । ”

“আমি কি বলছেন ?”

“আমারা দু’জনে আমার ট্রেনিং স্কুল ভিজিট করবো । ” জেনারেল হাসলেন । “এটি মাটির নিচে । আমার বারজন ছাত্র আছে সেইখানে । তাড়া স্পেইনের । তাদের ভাগ্য খারাপ শিলাতে আটকে গিয়েছিলো । অনেক নীচ জাতি , খারাপ লাগছে বলতে । জঙ্গলে বাস করতো তারা । ” সে হাত তুললেন । ইভান তুর্কিশ কফি এগিয়ে দিলো । রেইন্সফোর্ড কাপ এগিয়ে নিয়ে এক চুমুক দিলো ।

“এটাই খেলা । ” জেনারেল বিনীতকরে বললেন । “আমি তাদের একজনকে নিয়ে শিকারে যাই । তাদেরকে খাবার দেই , ছুরি দেই । আমি তাদেরকে তিনঘণ্টা সময় দেই । এক ছোট বন্দুক নিয়ে আমি তাদেরকে ফলো করি । যদি আমার লক্ষ্য থেকে তারা তিনদিন পালিয়ে থাকতে পারে , তাহলে সে জিতে যাবে । যদি আমি তাঁকে পাই — ” জেনারেল হাসলো — ” সে হারিয়ে যায় । ‘

“যদি তারা শিকার হবার জন্য না মেনে নেই ? ”

“আহ্‌ , ‘ জেনারেল বললেন , ” আমি তাদেরকে অপশন দেই । যদি তাদের ভালো না লাগে তাদেরকে খেলে না । আমি ইভানের দিকে সরিয়ে দেই । গ্রেট হোয়াইট জারেরহয়ে অফিসিয়াল কাউনটার হিসেবে একদিন কাজ করার সুযোগ হয়েছিলো । সে এইসব খেলা ভালোই জানে । সাধারণ তারা শিকার হওয়াটাকেই পছন্দ করে । ”

“যদি তারা জিতে যায় ?”

জেনারেলের মুখে হাসি , বললেন , “এখন পর্যন্ত আমি হারি নি । আশা করি আপনি আমাকে অহঙ্কারি ভাববেন না , মিঃ রেইন্সফোর্ড । অনেকেই প্রাথমিক কিছু সামর্থ্য করতে পারে না । তখন , আমি চাবুক দিয়ে মারি । কুকুরও ব্যবহার করি ।

“কুকুর ?”

“এইদিকে , চলুন , আপনি দেখাচ্ছি । ”

জেনারেল রেইন্সফোর্ডকে জানলার দিকে দেখালেন । জানালা থেকে আলোগুলো নিচের আঙিনায় পৌছে এক অদ্ভুত দৃশের সৃষ্টি করেছে , রেইন্সফোর্ড দেখলো কালো আকারের কিছু একটা ঘুর ঘুর করছে , তার দিকে তাকানো মাত্র জ্বলজ্বল করে উঠছে ।

“বরং অনেক ভালো , আমি মনে করি ” জেনারেল বললো । “তারা রাত সাতটায় বেড়িয়ে পড়ে । যদি আমার বাড়িতে কেউ আসতে চায় , বা বেরোতে চায় , তাঁকে একদম করুন দশা করে ফেলে । ” তারপর তিনি গুন গুন করে গান ধরলেন ।

“আর এখন ” রেইন্সফোর্ড বললেন , “আমাকে ক্ষমা করবেন জেনারেল , আমার শরীরটা ভালো লাগছে না । ”

“আহ, সত্যি । ” আগ্রহ করে জিজ্ঞেস করলেন । “মনে হয় স্বাভাবিক । অনেক লম্বা সাঁতার কাটার পর তা খারাপ লাগতেই পারে । আপনার ভালো বিশ্রামের দরকার । কালকে একদম সুস্থ হয়ে যাবেন । আমি প্রতিজ্ঞা করে বলছি , আমরা কালকে শিকারে যাবো । হ্যাঁ ? আমার আরও আরেকটি চিন্তা আছে । ” রেইন্সফোর্ড তাড়াতাড়ি করে রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে লাগলো ।

“সরি , আপনি আমার সাথে এই রাতে যেতে পারবেন না । ” জেনারেল বললেন । ‘আমি বরং আরও ভালো , জমজমাট খেলা পছন্দ করি । তাঁকে ভালোই দেখাচ্ছে – ভালো , শুভরাত্রি । মিঃ রেইন্সফোর্ড । ‘

বিছানাটা ভালো ছিল । সিল্কের পাজামার সুতাটা তার কাছে ভালোই লাগছিলো , অনেক ক্লান্ত সে । তারপরও ঘুমের ঔষুধ খেয়েও ঘুম আসছে না । ঘরে চুপি চুপি পায়ের আওয়াজ একবার শুনেছিল । সে দরজা খুলতে চেয়েছে , কিন্তু খুললো না , তিনি জানালার বাইরের দিকে তাকালো । তার রুম , টাওয়ারের অনেক উপরে , বাইরের বাতি সব নিভানো । নিঃশব্দ অন্ধকার । চাঁদের জ্যোৎস্না পড়ছে । কিন্তু অল্প চাঁদের আলো দিয়ে অল্প দেখতে পারছে । সেইখানে কিছুক্ষণ পর পর ছায়া । কোন শব্দ নেই । কুকুরদের শব্দ শুনতে পেলো । উপরের দিকে তাকিয়ে আছে । রেইন্সফোর্ড বিছানায় ফিরে শুয়ে পড়লো । অনেক ভাবে চেষ্টা করলো ঘুমানোর , সকালে চোখটা লেগে আসছিলো । তখনই বন্দুকের আওয়াজ শুনতে পেলো ।

জেনারেল জ্যারফ দুপুরের খাবারের আগে আসে নি । উল্টা পাল্টা পোশাক পড়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে , ক্ষণে ক্ষণে তিনি রেইন্সফোর্ডের স্বাস্থের প্রতি খোঁজখবর নিচ্ছেন ।

“আমার জন্য ” জেনারেল নিঃশ্বাস নিলেন । “আমার খারাপ লাগছে , আমি চিন্তিত , মিঃ রেইন্সফোর্ড । গতরাতে , আমার পুরান অভিযোগের কিছু নিশানা পেয়েছি । ”

রেইন্সফোর্ড প্রশ্ন করতেই যখন যাবে , তখন তিনি বললেন , “বিরক্তিকর ”

তারপর , পাঁপড় হাতে নিতে নিতে বললেন , “কালকের রাতে শিকার ভালো ছিল না , সহচারী তার মাথা হারিয়ে ফেলেছে , সে সোজা যাচ্ছিলো , তাই তেমন কোন কষ্ট হয় নি । এটাই নাবিকদের সমস্যা । কিভাবে শুরু করতে হয় তা তারা জানে না , জঙ্গলে পথও চলতে জানে না । তারা একদম বোকার মতন কাজ করে । আপনি কি আরেক গ্লাস মদ নিবেন ?”

“জেনারেল ” রেইন্সফোর্ড বিনীত করে বললেন , “আমি এখন এই আইল্যানড থেকে বিদায় নিতে চাচ্ছি । ”

জেনারেল তারা ভ্রূ কুঁচকিয়ে উঠলো । মনে হচ্ছে আখাত পেয়েছে । “কিন্তু আমার ভাই , আপনি তো এইখানে ভালোই আছেন । নিরাপদেই আছেন , নিরাপদেই আছেন । মাত্র এসেছেন । আপনি শিকার করছেন না । ”

“আমার আজকে চলে যাবার ইচ্ছা । ” রেইন্সফোর্ড বললো । জেনারেলের চোখে তার মৃত্যুকে দেখলো , তাঁকে ভালো করে লক্ষ্য করছে । হঠাৎ চেহেরা ফর্সা হয়ে উঠলো ।

সে রেইন্সফোর্ডের জন্য আরেক গ্লাস মদ নিলেন ।

“আজকে রাতে,” জেনারেল বললেন । “আমরা শিকার করবো – আপনি আর আমি ”

রেইন্সফোর্ড মাথা নাড়ালেন । “না , জেনারেল , আমি শিকার করবো না ”

জেনারেল কাঁধ ঝুকিয়ে একটি আঙ্গুর নিলো । বললেন , “আপনার যেমন ইচ্ছে , পছন্দ পুরোটাই আপনার উপর । কিন্তু আমার কোন বলার ইচ্ছে নেই , আমার পছন্দে বাদ দিয়ে ইভানকে নেন ?”

সে ইভানের দিকে মাথা ঘুরালেন । দানবটা দাঁড়ানো আছে , চোখ রাঙ্গিয়ে তাকিয় আছে , তার মোটা মোটা হাত তার বুকের উপর ।

“আপনি এতো খারাপ হতে পারেন না —— ” রেইন্সফোর্ড বললেন ,

“আমার প্রিয় ভাই , ” জেনারেল বললেন । “আমি আপনাকে কি বলেছিলাম না শিকার করার সময় আমি অনেক খারাপ হয়ে যায় । ” জেনারেল গ্লাস তুললো , কিন্তু রেইন্সফোর্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকলো ।

” আপনার এই খেলাটা মুল্যবান হবে । ” জেনারেল উৎসুকভাবে তাকালেন । আপনি আমার বিপক্ষে , আপনার রাস্তা পুরাটাই উল্টা । আপনার শক্তি , সাহস পুরোই আমার বিপক্ষে । বাইরের দাবা খেলা !! দাম ছাড়া বাজির কি আর মানে আছে , হ্যাঁ ?

“যদি আমি জিতে যাই ” রেইন্সফোর্ড শুকনো গলায় বললেন ।

“আমি যদি আপনাকে তিনদিনের মধ্যে না পাই , তাহলে আমার নৌকা শহরের নিকট রাখা থাকবে ” জেনারেল বলতে বলতে লক্ষ্য করছেন রেইন্সফোর্ড কি মনে করছে ।

“আহ , আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন , একজন খেলোয়াড় বা ভদ্রলোক হিসেবে আমি আপনাকে কথা দিলাম । কিন্তু একটা কথা বলতে চাই , পরে এইখানে আর কোনদিন ভ্রমনে আসবেন না ।”

“আমার এই ব্যাপারে সম্মত ” রেইন্সফোর্ড বললেন ।

“আহ, তাহলে এই ব্যাপারে আর কথা কেন ? আমরা তিন দিনের ব্যাপারে কথা বলতে পারি ” জেনারেল বললেন ,

জেনারেল গ্লাসে চুমু দিতে দিতে বললেন ।

তারপর তিনি কাজে নেমে পড়লেন । “ইভান ” তিনি রেইন্সফোর্ডকে বললেন । “আপনি কি জামাকাপড়, খাবার, একটি ছুরি দিতে পারবেন । আমি পরামর্শ দিব , মোটা কাপড়ের জুতা পড়েন । হালা পায়ের ছাপ পড়বে । আরেকটা ব্যপার , দক্ষিনের কর্নারে , বিল এড়িয়ে চলবেন , আমরা এটিকে ডেথ সোয়াম্প বলি , সেইখানে চোরাবালি আছে । এক বোকা সেই কাজ করেছিলো । কপাল খারাপ যে, এক গরীব লোক তাঁকে অনুসরণ করছিল । আমার মনের অবস্থা কি বুঝতে পারছেন , মিঃ রেইন্সফোর্ড । আমি গরীব মানুষকে পছন্দ করি । আমার জন্য এটি অনেক বড় শিকার ছিল । আর হ্যাঁ, আমি দুপুরবেলাইয় ঘুমাই , তাই বিশ্রামের জন্য অনেক সুযোগ পাবে । রাতে শিকার করাটা অনেক মজার । তাই না ? বিদায় , মিঃ রেইন্সফোর্ড ” মাথা নামিয়ে বিদায় নিলেন ।

আরক দরজা থেকে ইভান আসলো । এক হাতে , খাকি রঙের জামা , খাবারের ঝোলা , শিকার করার জন্য লম্বা ছুরি । বাম হাতে রিভাল্ভার ।

দুই ঘণ্টা ঝোপঝাড়ের উপর দিয়ে যাবার সময় অনেক কষ্ট করতে হয়েছে , ” আমাকে সাহস রাখতে হবে । আমি অবশ্যই সাহস রাখবো । ”

“আমি তাঁকে আরেকটি চিহ্ন দিবো , ” রেইন্সফোর্ড বিড় বিড় করে বললো । দুর্গম রাস্তায় সে এদিক সেদিকে ছুটতে থাকলো । সে জটিল এক রাস্তা তৈরি করলো । সে উলটাপাল্টা অনেকগুলা রাস্তা তৈরি করলো । রাতে পা ক্লান্ত হয়ে গেলো । হাত মুখ দিয়ে শাখা প্রশাখা বাড়ি দিতে দিতে আগালো । সে জানতো রাতে চলাটা বিপদজনক , কিন্তু তার সাহস ছিল । তার বিশ্রাম নেয়াটা খুব দরকার ছিল । “আমি শিয়ালের সাথে খেলেছি , এখন রূপকথার বিড়ালের সাথে খেলবো । ” সে এক অনেক বড় গাছে উঠে পড়লো । সেখানে নিশ্চিন্তে একটা ঘুম দিলো । জেনারেল জ্যারফ তাঁকে এইখানে খুঁজে পাবে না । একমাত্র শয়তান ছাড়া কেউ তাঁকে খুঁজে পাবে না , যদিও জেনারেল নিজেই একটা শয়তান ।

রাত আস্তে আস্তে গভীর হলো । ঘন জঙ্গলে চারদিকে নিঃশব্দতা । সকাল বেলাইয় কিছু পাখির চিৎকার , রেইন্সফোর্ডের ঘুম ভেঙ্গে দিলো । তাকিয়ে দেখলো , কিছু একটা এইদিকে আসছে । পাতা দিয়ে নিজেকে আবৃত করে ফেললো । সে দেখতে লাগলো , এক লোক এগিয়ে আসছে ———-

এটি জেনারেল জ্যারফ ছিল । তার গতিবিধির উপর আগে থেকে নজরে রেখছিল । গাছের নিচে সে থামলো । হাঁটু নিচে করে মাটির চিহ্ন ভালো করে দেখতে থাকলো । রেইন্সফোর্ড জেনারেলের বাম হাতে পিস্তল দেখেলো , চিতাবাঘের মতন গাছে আটকে থাকলো ।

শিকারি কয়েকবার মাতাহ নাড়ালেন , মনে হচ্ছে ধাঁধায় পরে গেছে । সে সোজা হয়ে কালো সিগারেট আগুন ধরালেন । এর ঝাঁঝালো গন্ধ রেইন্সফোর্ডের নাকে গেল ,

রেইন্সফোর্ডের নিঃশ্বাস ভারি হয়ে গেল । জেনারেল মাটি থেকে চোখ উপরে নিয়ে গাছের উপর তাকালেন । কিন্তু যেখানে রেইন্সফোর্ড শুয়ে আছে , সেইখানে চোখ যাওয়ার আগেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলেন । এক হাসি তার মুখে ছড়িয়ে গেল । ভেবেচিন্তে মুখ ধোঁয়া বের করে , আবার চলতে শুরু করলেন । জুতার শব্দ ধীরে ধীরে আস্তে আস্তে হতে থাকলো ।

ধোঁয়া তার নিশাস বন্ধ করে দিচ্ছিল । সে প্রথমে দুর্বল হয়ে যাচ্ছিলো । জেনারেল রাতেও তার চিহ্ন অনুসরণ করেছে , তার তৈরি কঠিন চিহ্ন অনুসরণ করতে পেরেছে , তার মানে , সে অদ্ভুত ক্ষমতা আছে । সাধারণ কসাক সৈন্য হলে এটি পারার কথা ছিল না ।

রেইন্সফোর্ড আরেকটি ব্যাপারে চিন্তা করতে লাগলো , জেনারেল কেন হাসল ? কেনই বা ঘুরে গেল ?

রেইন্সফোর্ড কিছু বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না । কিন্তু সূর্য উঠার সাথে সাথে শিশির চলে যাচ্ছে । জেনারেল তার সাথে খেলছে !! আরেকটি দিন খেলতে চাচ্ছে ! সেই কসাক বিড়াল , আর সে ইদুর । পুরো ব্যাপারটা ভাবতেই শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো ।

“আমি সাহস হারাবো না , যেইভাবেই হোক ”

সে গাছ থেকে আস্তে আস্তে নিচে নামলো । সে এক বুদ্ধি বের করলো । তিন গজ দূরে লুকানোর জায়গা পেলো । সেইখানে অনেক গাছ কাঁটা পড়ে ছিলো ।

সে একশ গজ দূরে গাছের গুড়ি ফেলে লুকিয়ে পড়লো । তাঁকে বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হয় নি , বিড়াল ইদুরের সাথে খেলতে চলে এসেছে ।

সেই পথ ধরে জেনারেল চলে আসলো । চোখ থেকে কোন কিছু বাদ যাচ্ছে না ,কোন দলানো ঘাস , কোন বাঁকানো গুড়ি , কোন চিহ্ন কিছুই নেই । কসাকের সন্দেহ , রেইন্সফোর্ড আসার আগে এটি বানিয়েছে । পা বাড়ানোর সময় গাছের ডালের সাথে স্পর্শ করলেন , সেটি ছিল ট্রিগার । যখনই স্পর্শ করলেন ,তিনি বুঝতে পারলেন এইখানে বিপদ আছে , সে দ্রুত পিছনে সরে আসলেন । কিন্তু খুব দ্রুত সরতে পারেন নি , গাছ একটির সাথে আরেকটি ভালো করেই লাগানো ছিল । একদম ভেঙ্গে ঘাড়ে পড়লো । কিন্তু সতর্কতার জন্য ভর্তা হবার থেকে বেঁচে গেছেন । সে আঘাত পেয়েছে , কিন্তু পড়ে যাই নি । সে ওইখানে দাঁড়িয়ে ছিল , ঘাড় মালিশ করছে । রেইন্সফোর্ডের বুক আবার ধুব ধুব করতে লাগলো । জেনারেলের হাসি তার কানে আসলো ।

” রেইন্সফোর্ড ” জেনারেল ডাকলো । “আপনি যদি এইখানে থাকেন তাহলে আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন । আমাকে আগে শুভেচ্ছা জানাতে দিন । কোন মানুষ জংলীদের মতন মানুষ ধরার জিনিষ বানাতে পারে না । আমি মালাকাতে আক্রমণের শিকার হয়েছিলাম । আপনি ভালোভাবেই কাজটা করেছেন , মিঃ রেইন্সফোর্ড । আমি ব্যাথা পেয়েছি । কিন্তু আমি আবার আসবো । ”

যখন জেনারেল চলে গেলেন , রেইন্সফোর্ড কিছুটা স্বস্তি পেলেন । চলতে শুরু করলো আবার । কোথায় যাবে কিছুই জানা নাই । সন্ধ্যা নেমে আসলো । গাছপালার ছায়া বাড়তে থাকলো । পোকামাকড়রা তাঁকে কামড় দেয়া শুরু করলো /

সে চলতেই থাকলো । কিন্তু তার জুতো কাদায় ভিজে গেল । সে এটি ধোবার চেষ্টা করেছিলো , কিত্নু কিন্তু পায়ে জোঁক ধরেছে । অনেক কষ্টে জোঁক থেকে মুক্তি পেলো । সে জানে এখন কোথায় এসেছে । ডেথ সোয়াম্প আর চোরাবালি ।

হাতড়াতে হাতড়াতে এগোতে থাকলেন । শীতল রাত্রি তাঁকে এক বুদ্ধি দিলো । সে চোরাবালি থেকে কয়েকগজ দূরে ফিরে ফেলেন । যা করতে যাচ্ছেন , তা এক ধরণের ঐতিহাসিক ব্যাপার তার জন্য ।

সে মাটি খুঁড়তে শুরু করলেন । গর্ত কাঁধ পর্যন্ত গভীর হলো । সে কিছু পাতা , কাণ্ড কেটে নিয়ে আসলো । আর গর্তের মুখে রেখে দিলো । হাত দিয়ে আগাছার আস্তর তৈরি করলেন চারপাশে । ক্লান্ত হয়ে সে গাছের গোঁড়ার নিচে ঘুমিয়ে পড়লেন ।

সে জানে তাকে খোঁজার লোক আসছে । নরম মাটিতে পায়ের শব্দ শুনা যাচ্ছে । রাতের বাতাস তার সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ চারপাশ ভরে গেছে । রেইন্সফোর্ড গাছের পিছনে বসে রইলেন । সাহ্মনে কি হচ্ছে কিছুই দেখতে পারছে না । তার খুশীতে কান্না চলে আসছে । কারণ , গর্তের মুখে গাছপালা ভেঙ্গে যাবার শব্দ শুনতে পারবে । গর্ত যেখানে সে তৈরি করেছিলো , সেখান থেকে এক চিৎকার শুনতে পেলো । সে চুপি চুপি সামনে এগিয়ে আবার পিছনে ফিরে আসলো । তিন ফিট দুরেই এক লোক হাতে টর্চ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।

“আপনি দারুন কাজ করেছেন , রেইন্সফোর্ড “জেনারেলের কণ্ঠ ভেসে আসছে । আপনার বার্মিজ গর্ত আমার এক কুকরকে কাবু করতে পেরেছে । আপনি আবার আঘাত করলেন । আমি আবার আসবো , পুরো শক্তি নিয়ে । আমি ঘরে যাচ্ছি । অসংখ্য ধন্যবাদ দারুন এক সন্ধ্যা দেবার জন্য । ”

দিনের পর , রেইন্সফোর্ড জলাভুমিতে পড়ে রইলেন । এক আওয়াজ তাঁকে আবার সচকিত করে তুললো । অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে শব্দটি , কিন্তু তার পরিচিত । এক ধরণের কান্নার শব্দ /

রেইন্সফোর্ড জানে সে দুইটা জিনস এখন সে করতে পারে । এক , এইখানে থাকতে পারে , আরেকটি হলো আত্মহত্যা । সে পালাতে পারতো । সেটিই দরকার ছিল । কিছুক্ষনের জন্য ইন্তা করলেন , আর এক বুদ্ধি বের করলেন । বেল্ট শক্ত করে বেঁধে সামনের দিকে আগালো ।

শব্দ আস্তে আস্তে কাছে আসছে । এক গাছের উপরে উঠে পড়লো । এক মাইল সামনে এক নালা গেছে । জঙ্গলের পাতা গুলো দুলছে । জেনারেল জ্যারফ সামনেই আছে । এই আরেকজনকে সাথে করে নিয়ে এসেছে । সে ইভান । সাথে শিকল দিয়ে আরও কিছু শক্তি আছে ।

আর এক মিনিটের দুরত্ব । উগান্ডা থাকাকালীন এক কৌশল শিখেছে , সেটাই প্রয়োগ করলো । সে গাছে পিছলে পড়লো । তারপর কিছু পাতা নিয়ে ছুরি আটকালেন , তাতে আঙ্গুর গাছের কিছু পাতা আতকিয়ে দিলো । তারপর সে প্রানের জন্য দৌড়ানো শুরু করলো । সেই গন্ধের দিকে তারা আওয়াজ করতে থাকলো । রেইন্সফোর্ড জানে প্রাণীরা পাতাগুলো দেখলে কি রকম মনে করে ।

সে এক নিঃশ্বাস নিলো । চিৎকার হঠাৎ থেমে গেল । তারা হয়তো এখন ছুরি নিয়ে চলা শুরু করেছে ।

সে এক গাছের উপর উঠে তাকালো । তারা থেমে গেছে । কিন্তু এক ব্যপার , জেনারেল জ্যারফ এখন হাঁটছে । কিন্তু ইভান না ।

যখন আবার তারা চিৎকার দেয়া শুরু করলো , রেইন্সফোর্ড এক লাফ দিয়ে নিচে ধপাস করে পড়লো ।

“জোরে , জোরে , আরও জোরে ! ” তার হাঁপাতে লাগলো । সামনে দুই মৃত গাছের ফাকে নীল অংশ দেখতে পেলো । চিৎকার আস্তে আস্তে কাছে চলে আসছে । রেইন্সফোর্ড সেই ফাঁকের ভিতর দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলো । সে সাগরের তীরে পৌঁছে গেল । সাগরের দিকে এক ধুসুর রঙের দুর্গ দেখেতে পেলো । বিশ ফিট নিচে সাগর এসে মিলেছে । রেইন্সফোর্ড কি করবে বুঝতে পারছে মা । সে চিৎকার শুনা মাত্রই , সাগরে ডুব দিলো ……………

যখন জেনারেল আর তার বাহিনি সাগরে পৌঁছল , তারা থেমে গেলো । দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নীল সবুজ বিস্তৃত পানি দেখতে থাকলো । তারপর বসে সিগারেট ধরালো , আর মদে চুমুক দিলেন । সাথে গুন গুন করে গান করা শুরু করলো ।

জেনারেল জ্যারফ বিশাল এক ডিনারের আয়োজন করলেন । দুইটা বিষয় তাকে ভাবিয়ে তুলছে , এক ইভানের বিকল্প আরকেজনকে রাখা কঠিন হবে , আরেকটি ব্যাপার , তার শিকার পালিয়ে গেছে । ডিনারের পরে , লাইব্রেরীতে বসে বই পড়তে লাগলেন । রাত দশটায় ঘুম থেকে উঠলেন , কিন্ত অনেক ক্লান্ত তিনি । বাতি জ্বালিয়ে জানালার বাইরের দিকে তাকালেন । সে কুকুরদেরকে বললেন , “আশা করি পরের বার ভালো হবে । ” তারপর বাতি বন্ধ করে দিলেন ।

এক লোক বিছানার মশারির মধ্যে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।

” রেইন্সফোর্ড ” জেনারেল চিৎকার দিয়ে উঠলেন । “কিভাবে আপনি আসলেন ?”

“সাঁতার কেটে । ” রেইন্সফোর্ড বললেন । “জঙ্গলে হাঁটার চেয়ে অনেক দ্রুত সাঁতরে এসেছি । ”

জেনারেল হেসে বললেন , “আপনাকে অভিনন্দন । আপনি জিতেছেন । ”

রেইন্সফোর্ড হাসলেন না । “আমি এখনো পশু । ” সে বললো । শুষ্ক গলায় তিনি বলেন “তৈরি হোন এবার , জেনারেল জ্যারফ ।”

জেনারেল মাথা নত করে সম্মান জানালেন । “আমি দেখেছি । অনেক চমৎকার । আমদের মধ্যে একজনকে এই চিৎকারের ভোজন হতে হবে । অন্যজন এই সুন্দর বিছানায় ঘুমাবে । আমি তৈরি , রেইন্সফোর্ড “…

রেইন্সফোর্ড  , সে কখনো ভালো বিছানায় ঘুমান নি ।

translated from: https://archive.org/stream/TheMostDangerousGame_129/danger.txt

আরও গল্প পড়তে ক্লিক করুনঃ

প্রথম স্কুলে যাবার দিনঃ ছোট গল্প

A Double-Dyed Deceiver 

HEARTACHE

The Luncheon

The Gift of Magi

A MOTHER IN MANNVILLE

 

The Most Dangerous Game : Translation in Bangla | Razib Ahmed