(আজকে লিখতে পেরেছি ২১৪৫ শব্দ। ১২৮ পেইজের একটা ঐতিহাসিক ঘটনাবহুল গল্পকে মাত্র ২১৪৫ শব্দে কমিয়ে আনতে অনেক চিন্তা ভাবনা করতে হয়েছে। অনেক বড় একটা সময় ইনভেস্ট করতে হয়েছে। তবে প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পেরে ভীষন ভালো লাগছে।) দারতানিয়া বাবার দেয়া একটা টাট্টুঘোড়া আর একটা চিঠি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল ফ্রান্সের রাজা ত্রয়োদশ লুই এর একজন মাস্কেটিয়ার্স হওয়ার উদ্দ্যেশ্যে। তার বাবার আর্থিক অবস্থা তখন খুব শোচনীয়, তাই খুব বেশি কিছু ছেলেকে দিতে পারল না, তবে অবশ্যই সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাই দিয়েছিল, আর তা হলো কিছু অমূল্য উপদেশ। বলছিলেন তিনি, “সময় হয়েছে বাছা। যশ, ঐশ্বর্য, প্রতিপত্তির জন্য দুনিয়ার পথে বেরিয়ে পরো এইবার। একমাত্র সাহস আর তলোয়ারের জোর থাকলেই আজকাল ধনী হয় মানুষ। আমার উপদেশ মনে রেখো ঝগড়া বিবাদ কে ভয় পেয়োনা কখনো, দুঃসাহসিক কাজে পিছপা হয়ো না। তলোয়ার চালনার নিয়ম-কানুন সব শিখিয়েছি তোমাকে, ইস্পাতের কব্জি আছে তোমার। সুতরাং লড়বে, সুযোগ পেলেই লড়বে। এই চিঠি আর পনেরোটা স্বর্ণমুদ্রা ছাড়া আর কিছুই নেই আমার তোমাকে দেয়ার মতো। আমার পুরোনো বন্ধু মসিয়ে দ্যা ত্রেভিয়ের কাছে লিখেছি চিঠিটা, ওর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। যখন ও প্যারিসে যায় তখন তোমার মতোই ভাগ্য বিড়ম্বিত এক যুবক। আর এখন মাস্কেটিয়ার্সদের ক্যাপ্টেন ,রাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব্য ওর কাঁধে। শুনেছি কার্ডিনাল রিশেলিও এর মতো লোকও তাকে সমীহ করে চলে ওকে। তুমি যেভাবে শুরু করতে যাচ্ছ ,ও-ও সেভাবেই শুরু করেছিল জীবন। সুতরাং ঘাবড়াবার কিছু নেই। চিঠিটা নিয়ে সোজা চলে যাবে ওর কাছে। ও যেভাবে উঠেছে, তুমিও সেভাবেই উঠতে পারবে আশা করি।“
দারতানিয়াতের বাবার এই উপদেশগুলো নিঃসন্দেহে ধনসম্পদ আর টাকা পয়সার থেকে লাখোগুন বেশি মূল্যবান। ওর ঘোড়াটার এমন নাজেহাল অবস্থাই ছিল যে পথচারীরা দেখে হাসছিল। যাই হোক, এটায় চড়েই অনেক মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এক সরাইখানায় পৌছাল সন্ধ্যায়। সরাইখানায় পৌছুতেই হলো এক ঝামেলা, পথচারীরা তো ঘোড়াটা দেখে শুধু হাসছিল আর এখানে এক লোক হাসার পাশাপাশি ব্যাঙ্গাত্ত্বক মন্তব্য করতেও ছাড়ল না, লোকটার গালে একটা কাটা দাগ দেখতে পেলো সে। দারতানিয়াত আর সহ্য করতে পারল না, আক্রমণ করে বসল লোকটাকে। সে আর যায় কোথায়, ওই লোকের সাথে আরও যারা ছিল সবাই একসাথে আক্রমণ করল দারতানিয়াত কে। সে উঠে দাঁড়ানোরও সুযোগ পেল না, জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সরাইয়ের মালিক উপরে নিয়ে গেলো ও কে, সেবা শুশ্রূষা করতে লাগল। জ্ঞান ফিরে আসতেই বলল, মসিয়ে দ্যা ত্রেভিয়ে তার বন্ধু, এই অপমানের কথা জানলে উনি ব্যবস্থা নিবেন, মোকাবেলার জন্য যেন তৈরী থাকে ওরা। বলেই আবার সে জ্ঞান হারায়। এইটা শুনে তো সেই ঝগড়া বাঁধানো লোকটা আরও ক্ষেপে গেল। দারতানিয়াতের জিনিসপত্র কোথায় রেখেছে জেনে সেগুলো হাতড়ে ওর চিঠিটা হাত করে নিল। এদিকে কিছু গোলমেলে লাগায় সরাইমালিক দারতানিয়াত কে ঘুম থেকে ডেকে বলল, যদিও দেখছি তুমি দুর্বল, তারপরও বলব, যত দ্রুত সম্ভব চলে যাও এখান থেকে। দারতানিয়াত কিছুটা ঘোরের মাঝেই দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেই দরজা খুলল, দেখল যে, একটা ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই গালকাটা লোকটা একটা সুন্দরী মহিলার সাথে কথা বলছে। ওদের কথাবার্তা সে শুনতে পেল, প্রধানমন্ত্রী কার্ডিনালের নির্দেশে সুন্দরী মেয়েটাকে লন্ডন পাঠানো হচ্ছে গুপ্ত কোনো সংবাদ জানানোর জন্য। ওরা দারতায়াকে দেখে খুব দ্রুত ঘোড়া আর গাড়ি ছিটিয়ে পালাল। রাত টা দারতায়া সরাই এই কাটাল। সকালে উঠে পোশাক পরতে গিয়ে দেখল তার চিঠিটা উধাও। সরাই মালিকের কথায় বুঝল গাল কাটা লোকটা চুরি করেছে চিঠি। রাগে ফোঁসতে ফোঁসতে রওনা হলো দারতায়া প্যারিসের পথে এই ভেবে যে, এই লোক কে আরেকবার পেলে ওর শেষ দেখে ছাড়বে।
যে প্যারিস পৌছেই ত্রেভিয়ের সাথে দেখা করবার জন্য গেল ওর সদর দপ্তরে।
সেখানে গিয়েই কিছু জিনিস দারতায়া বুঝতে পারল। প্রধানমন্ত্রী কার্ডিনাল রিশেলিও আর রাজা ত্রয়োদশ লুই এর মাঝে তুমুল প্রতিদ্বন্দীতামূলক সম্পর্ক বিরাজমান। তাদের আলাদা আলাদা শক্তিশালী সৈন্য বাহিনী রয়েছে। কার্ডিনালের বাহিনী আর রাজার মাস্কেটিয়ার্স বাহিনীর মাঝে সব সময় দন্দ্বযুদ্ধ লেগেই থাকে, যদিও ডুয়েল লড়া নিষিদ্ধ তখন কিন্তু কে শুনে কার কথা। কার্ডিনাল আর রাজা একে অপরকে বিপদে ফেলতে পারলেই যেন সুখী হয়, এদিকে রানী অস্ট্রিয়া হলেন কার্ডিনালের দুই চোখের বিষ। সব সময় কার্ডিনাল রানীকে বিপদে ফেলার, অপমান করার সুযোগ খোঁজে। আর রাজাকে যারা সম্মান করেন, অনুগত্য করেন সবাই কার্ডিনালের চোখের বিষ, তাই রাজার প্রিয়ভাজন ত্রেভিয়া কে সে খুব অপছন্দ করে।
তো, অনেক সময় অপেক্ষা করার পর ত্রেভিয়ার সাথে দেখা করার সুযোগ এলো দারতায়ার, জানাল সে মাস্কেটিয়ার্স হতে এসেছে, ওর বাবার দেয়া চিঠিটা চুরি হয়ে গেছে। ত্রেভিয়ে জানতে চাইল ঘটনাটা, সে বলল পুরো কাহিনী। গালে কাটা দাগওয়ালা লোকটার কথা শুনেই ত্রেভিয়ে দারতায়া কে সাবধান করে দিল, এই ভয়ংকর লোকটাকে যেন সব সময় এড়িয়ে চলে সে। কিন্তু দারতায়ার চোখে প্রতিশোধের আগুন, সে সামনে পেলে আর ছাড়বেনা ওকে। এমনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই দেখতে পেল সেই লোককে। এক দৌড়ে বের হয়ে গেল। প্রথমে সিঁড়িতে ধাক্কা খেলো এক মাস্কেটিয়ার্স এর সাথে, দারতায়ার উপর রেগে গেল সে। দুজনের মধ্যে বেশ ঝগড়া বেধে গেল, আর পরস্পরকে দন্দ্বযুদ্ধে আহবান করল তারা। ঠিক দুপুর ১২টায় তারা ডুয়াল লড়বে লুক্সেনবার্গ প্রাসাদের পেছনে ঠিক হলো। ফটকের কাছে গিয়েই ধাক্কা খেলো আরেক মাস্কেটিয়ার্সের সাথে, এবং একিভাবে ঝগড়া বেঁধে ডুয়াল লড়বে বলে ঠিক হলো দুজনের সেই একি জায়গায়। যাকে ধরার জন্য এতো কাহিনী ঘটালো বের হয়ে আর তাকে খুঁজে পেল না, আবার ফিরে এলো ভেতরে। এইবার তার হুঁশ ফিরল দুজন মাস্কেটিয়ার্সের সাথে লড়বে সে!! বাঁচার কোনো আশা নেই ,প্রথমজনই হয়ত মেরে ফেলবে তাকে। এখন থেকে ওকে আরও বিনইয়ী হয়ে চলতে হবে ওদের সাথে। এসব ভাবতে ভাবতেই দুর্ভাগ্যবশত আরেক মাস্কেটিয়ার্সের সাথেও একিভাবে ডুয়াল লড়বে ঠিক হলো। মানে একি দিনে রাজার তিন শীর্ষ সৈনিকের সাথে দারতানিয়া ডুয়াক লড়ার সাহস দেখিয়ে ফেলল!!! নির্ধারিত সময়েই দারতায়া সেখানে হাজির হলো আর দেখতে পেল , যে ৩জনের সাথে ডুয়েল লড়ার কথা ওর এরাই আসলে থ্রী মাস্কেটিয়ার্স আর্থোস, পর্থোস আর আরেমিস।
একে একে ৩জনের সাথেই সে লড়াই করতে যাবে, এমন সময় কার্ডিনালের কিছু রক্ষী সেখানে হাজির হলো, দুই বাহিনীর একসাথে হওয়া মানেই লড়াই। কার্ডিয়ালের বাহিনীতে ছিল ৫জন, তার মাঝে একজন আবার ফ্রান্সের সেরা তলোয়ারবাজ জুসাক আর মাস্কেটিয়ার্সরা তখন ৩জন, দারতায়া বলল সে মনে প্রানে একজন মাস্কেটিয়ার্স ,রাজার অনুগত, তাই ওদের সঙ্গী হয়েই লড়বে।
শুরু হলো দুই পক্ষের লড়াই, দারতায়ার মুখোমুখি সেই বিখ্যাত যোদ্ধা জোসাক। বাঘের মতো লড়ে সে পরাজিত করল জোসাক কে। মাস্কেটিয়াররাই জিতে গেল, আর অভিবাদন জানাল দারতানিয়াকে, এবং বলল তারা এখন থ্রী মাস্কেটিয়ার্স থেকে ৪জন হলো। হাত ধরাধরি করে ৪জন এগিয়ে গেল সদর দপ্তরে। পুরো প্যারিস ওদের এই লড়াই এর কথা ছড়িয়ে গেল। মসিয়ে ত্রেভিয়ে তো বিশাল খুশি এতে, দ্রুত রাজার কানে এই খবর পৌঁছে দিতে চাইলেন তিনি। রাজাও শুনে বেজায় খুশি হয়ে গেল। দারতায়াকে ওইদিনই মাস্কেটিয়ার্সে যোগ দিতে বলল আর ৪জন কেই দিল উপহার।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী কার্ডিনাল রানীর পেছনে লেগেছেন, যে করেই হোক রানীকে অপমানিত করাই যেন তার লক্ষ্য এখন। রানীর একটা দুর্বলতার কথা সে জানত আর সেটাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইল সে। রানী আর ইংল্যন্ডের ডিউক ব্যাকিংহাম একে অপরকে ভালোবাসে, কার্ডিনাল তাই ডিউককে একটা চিঠি লিখল রানীর হয়ে যে, রানী ডিউকের সাথে দেখা করতে চায়। কার্ডিনালের ইচ্ছে ডিউক ফ্রান্সে এই খবর পাওয়া মাত্র আসবে আর ওকে আর রানীকে ষড়যন্ত্রকারী বলে ফাঁসিয়ে দিয়ে আটক করবে। রানীর কানে এই খবরটা পৌঁছালে, রানী ডিউক কে বাঁচাবার জন্য এবং তার মান সম্মান রক্ষা করার জন্য ব্যাকুল হয়ে গেলো। তার খুব বিশ্বস্ত একজন সেবিকা কন্সট্যান্টকে সে দায়িত্ব্য দিল ডিউক যেন কোনো ভাবেই ধরা না পরে সেই ব্যবস্থা করার জন্য। এদিকে দারতায়া ভাড়া থাকত সেই কন্সট্যান্টেরই চাচার বাসায়, চাচার মাধ্যমেই এই খবরগুলো দারতায়ার কানে পৌছাল আর জানল সেই কন্সট্যান্ট মেয়েটা এখন নিখোঁজ, ওকে কেউ আটক করে রেখেছে। আরও অনেক ঘটনার পর দারতায়াই সেই মেয়েকে অপহরণকারীদের হাত থেকে বাচাল আর মেয়েটার চাচাকে কার্ডিনালের রক্ষীরা ধরে নিয়ে কারাগারে বন্দি করে রাখল। এদিকে দারতায়া কন্সট্যান্ট মেয়েটার রূপমুগ্ধ হয়ে প্রেমে পরে গেলো।
কন্সট্যান্ট আবার কাজে লেগে গেল কিভাবে ডিউক কে বাঁচানো যায়। ডিউক রানীর সাথে দেখা না করে ফ্রান্স ত্যাগ করতে চাইল না, কন্সট্যান্ট তাকে লুকিয়ে অনেক ঝুঁকি নিয়ে রানীর প্রাসাদে নিয়ে গেল। রানী ওকে ফিরে এতে বলল আর কোনোদিন যেন ফ্রান্স না আসে তাও বলল। কিন্তু ডিউক রানীর কাছে তাদের সম্পর্কের নিদর্শন স্বরূপ একটা উপহার চাইল , রানী ওকে একটা বাক্স এনে দিলেন যা ছিল হীরার তৈরী একটা গহনা।
রানীর প্রাসাদেও ছিল কার্ডিনালের গুপ্তচর ,যার মাধ্যমে এই সব খবর ওর কানে পৌঁছাতে সময় লাগল না। ডিউক কে ওরা আর ধরতে না পারলেও কিভাবে রানীর সম্মানহানি করা যায় সেই প্ল্যান করল। ডিউক কে যে হীরার হারটা দিয়েছে রানী, সেটা রাজার কাছ থেকে পাওয়া এক উপহার ছিল, কার্ডিনাল এটা জানত এবং তাই রাজার কাছে এসে বলল, একটা বল নাচের আসর করতে আর রানীকে যেন উপহার দেয়া সেই হারটা পরে আসতে বলে, হার পরার কথাটা খুব জোর দিয়ে বার বার বলল। রাজা রানীকে তাই বললেন। রানী তো বিমর্ষ হয়ে গেল, এখন উনি কি করবেন। এইবারও সেই কন্সট্যান্ট মেয়েটা রানীর সাহায্যে এগিয়ে এলো। বলল যে করেই হোক হারটা ডিউকের থেকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে। কন্সট্যান্ট দারতায়াকে সব খুলে বলল এবং লন্ডন গিয়ে হারটা ওকেই ফেরত আনার জন্য অনুরোধ করল। দারতায়া ত্রেভিয়ের কাছে সব জানিয়ে ছুটি চাইলেন লণ্ডন যাওয়ার জন্য। ত্রেভিয়ে তাকে একা না গিয়ে তার অন্য ৩ সঙ্গী এবং তাদের চাকরদেরও সাথে নিয়ে যেতে বললেন ,কারণ কাজ টা অত্যধিক ঝুকিপূর্ন। কার্ডিনাল ভয়ংকর লোক, ওদেরকে ঠেকিয়ে রাখতে কোণো চেষ্টার ত্রুটি করবে না। বেরিয়ে পরল ৪বন্ধু ৪ চাকর কে নিয়ে। পথে অনেক লড়াই আর বাঁধা ঠেকিয়ে অবশেষে একা শুধু দারতায়াই তার চাকরকে নিয়ে সীমান্তে পৌছাতে পারল এবং জাহাজে করে লন্ডনে পৌছাল।
এদিকে কার্ডিনাল বিকল্প শইয়তানীও করে রেখেছিলেন যেন, হারটা ফেরত নিতে সক্ষম হলেও রানী বাঁচতে না পারে। তাই সে তার গুপ্তচর পাপিষ্ঠা রমণী ম্যালোডিকে আগেই লন্ডনে পাঠিয়েছিল কৌশলে ডিউকের হার থেকে দুই জোড়া হীরা কেটে নিয়ে আসার জন্য। ১২ জোড়া হীরা থেকে তাহলে ১০ জোড়া রয়ে গেলো।
দারতায়া লন্ডন গিয়ে ডিউক কে সব জানাতেই ডিউক হারটা যেই ফেরত দিতে বের করল দেখল এতে ২জোড়া হীরা কম আছে, সে বুঝল কি ঘটেছে। দ্রুত সে এক কারিগর কে মোটা অংকের টাকা দিয়ে সেইম দেখতে দুই জোড়া হীরা বানিয়ে এতে লাগিয়ে দিতে বলল এবং কারিগর সেটা বানিয়ে দিল। হার নিয়ে দারতায়া অবশেষে পৌছাতে পারল প্যারিসে।
কার্ডিনাল ভাবতে পারেনি রানী হারটা ঠিক ভাবেই পরে আসতে পারবে নাচের আসরে। কিন্তু রানী যখন একদম ঠিকভাবেই হার টা পরে আসল কার্ডিনাল ভেতরে ভীষন লজ্জিত, অপমানিত অনুভব করছিল আর রাগে ফোসছিল। যে তার এই প্ল্যান ভেস্তে দিল তার উপর আক্রোশে ফেটে পরতে চাইল সে।
এরপর একের পর এক ঘটতে থাকল অনেক ঘটনা। দারতায়ার ভালোবাসার সেই কন্সট্যান্ট মেয়েটাকে কার্ডিনালের রক্ষীরা ধরে নিয়ে বন্দী করে রাখল ,আর দারতায়া ওকে বাঁচিয়ে আনার জন্য তখন পাগলপ্রায়, কোনো চেষ্টাই সে আর বাদ রাখতে চাইল না। ঘটনাক্রমে ওর দেখা হলো কার্ডিনালের সেই গুপ্তচর ম্যালোডির সাথে। ভেবেছিল ম্যালোডির সাহায্যে সে কন্সট্যান্টকে উদ্ধার করতে পারবে, কিন্তু হায় উলটো এই মহিলা তাকেও মোহাচ্ছন্ন করে ফেলল ওর ছলনার আশ্রয় নিয়ে। দারাতায়ার কাছে তার এই ছলনা একদিন ধরা পরে গেল এবং জানতে পারল এই সেই মেয়ে যাকে তার বন্ধু আথোস বিয়ে করেছিল এবং বিয়ের পর জানতে পেরেছিল এই শয়তান মেয়েলোক আসলে ফ্রান্সের জেল পালানো এক দাগী আসামী। তখনই আথোস তাকে ফাসিতে লটকেছিল, কিন্তু এই পাপিষ্ঠা নারী বেঁচে ফিরে এসেছিল। এখনও তার ছলনায় প্রভাব বিস্তার করে ভুলিয়ে ভালিয়ে কুকর্ম সব করে যাচ্ছে সে।
এদিকে কার্ডিনাল আবার ষড়যন্ত্র করেই যাচ্ছিল একের পর এক। ডিউক অফ বাকিংহামকে ফাঁসাতে আবার পাঠাল মিলাডিকে লন্ডনে। কিন্তু দারতায়া আঁচ করতে পেরে আগেই চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছিল এর শয়তানী । লন্ডনে গেলে এইবার বন্দী করা হলো মিলাডিকে ,কিন্তু এইবারও পাহাড়াদারকে বশ করে পালাল সে, পাহাড়াদার ওর মোহে সব ভুলে ডিউক কেই খুন করে ফেলল!
ওইদিকে দারতায়া আর মাস্কেটিয়ার্সরা অনেক চেষ্টার পর বন্দী কন্সট্যন্টকে সন্ন্যাসী সাজিয়ে এক আশ্রমে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারল, কিন্তু কার্ডিনাল বোঝে গেল কোথায় কন্সট্যন্টকে রাখা হয়েছে, সে আবার মিলাডিকে খোঁজ করল কন্সট্যান্ট কে আশ্রম থেকে সরিয়ে আনার জন্য। কার্ডিনালের কোনো মারার ইচ্ছে নেই ওই মেয়েটা কে, শুধু ডিউক আর রানীর গোপন সব তথ্যগুলোর স্বীকারোক্তি চায়।
আশ্রমে মেয়েটা পৌঁছেছে জানার পরই দারতায়া রওনা হয়ে যায় তার বন্ধুদের নিয়ে সেখান থেকে ওকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়ার জন্য। কিন্তু ওরা পৌছাবার কিছু আগেই মিলাডি কন্সট্যান্ট কে নিয়ে পালাতে না পেরে ওকে বিষ খাওয়িয়ে রেখে যায়, আর মাস্কেটিয়ার্স রা আসার পরই বেচারীর মৃত্যু হয়। আর দারতায়া শোকে পাগলপ্রায় হয়ে যায়।
আথোস তার প্রাক্তন পাপীষ্ঠা স্ত্রীকে শাস্তি দেয়ার জন্যও তৈরী হয়ে যায়।
অবশেষে অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর ৪ মাস্কেটিয়ার্স অবশেষে মিলাডিকে মৃত্যুদন্ড দিতে সক্ষম হয়।
এদিকে কার্ডিনাল দারতায়া কে আটকের নির্দেষ দিল রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধে। দারতায়া কে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হলো কার্ডিনালের কাছে, দুইজনের মাঝে অনেক তর্ক বিতর্কের পর দারতায়া জানাল মিলাডির কথা যে, মিলাডি একটা দাগী আসামী হওয়া সত্ত্বেও কার্ডিনালের প্রিয়ভাজন ছিল । এই মিলাডিকে সে আর তার বন্ধুরা মিলে মেরে ফেলেছে ,কারণ মিলাডি তার ভালোবাসার মানুষকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে।
সব কথা শুনে কার্ডিনাল দারতায়ার সাহসিকতা আর বীরত্বে মুগ্ধ না হয়ে পারল না, এবং তাকে সাধারণ মাস্কেটিয়ার্স থেকে ল্যাফটেনেন্ট পদে অধিষ্ট করল এবং বন্ধু হিসেবে গ্রহন করল।
এদিকে দারতায়া ভাবল ওর থেকে ল্যাফট্যানেন্ট পদের জন্য ওর বন্ধুরাই বেশি যোগ্য, কিন্তু আর্থোস ,পর্থোস, আরমিস কেউই আর মাস্কেটিইয়ার্স থাকতে চাইল না, অবসর নিল থ্রী মাস্কেটিয়ার্স। দারতায়া একাই রয়ে গেল রাজার বিশ্বস্ত সৈনিক হয়ে।
আর এই গল্প থেকে শিক্ষা হলো-
খারাপ কাজের শাস্তি পেতে হয়ই এক সময়, আর সাহসীরা হয় পুরষ্কৃত। দারতায়া বাবার উপদেশ মেনেই সাহসিকতার সাথে লড়ে গেছে সব জায়গায়, ভয় পেয়ে পিছু হটেনি কখনো, যা করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়েছে সেটা সফল না করা পর্যন্ত ফিরে আসেনি।
আর সবকিছু ছাপিয়ে এই মাস্কেটিয়ার্স দের সাফল্যের পেছনে ছিল ওদের ৪ বন্ধুর মধ্যকার ঐক্য। তাদের বন্ধুত্বের শপথ ছিল,
“একজন সবার জন্য, সবাই একজনের জন্য।”
মানে যাই করুক, যাই ঘটুক ৪জন পরস্পরের জন্য হবে নিবেদিত প্রান। তাদের এই বন্ধুত্বের ঐক্যের জোরেই সব বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছে তারা। ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করার বিকল্প নেই এটা আমরা সবাই জানি। এই গল্প টা বারও এই শিক্ষাই দিল।
![]()
