গল্পের শুরুটাই এক মহৎ ব্যক্তির মহৎ চিন্তাধারা দিয়ে। সে তার পোষা নেকড়ের নাম রেখেছে হোমো, যার অর্থ “মানুষ “। আর নিজের নামটি রেখেছেন ঠিক তার উল্টো উর্সাস, যার অর্থ “ভালুক”। দেখতে সে মানুষও না আবার জীবও না। এক অদ্ভুত চেহারা তার দাঁড়ি-গোফ বড় বড়, তার উপর জটলা বাঁধা এক গাঁধা চুল মাথায়। হোমোর প্রতি তার সব সময় স্নেহভালোবাসার কমতি নেই, এমনকি রাতে যখন সে গাড়িতে ঘুমায় হোমো তখন গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পরে তবে বৃষ্টি হলে মাঝে মাঝে ভিতরের থেকে শব্দ আসে হোমো গাড়ির নিচে চলে যা এবং হোমো চলে যাওয়া মাত্রই চারিদিক থেকে ঝাপগুলো নেমে যায়, যাতে তার আর বৃষ্টির ভয় না থাকে।
উর্সাস হোমোকে নিয়ে বিভিন্ন জঙ্গলে এবং গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়ান তার গাড়ি নিয়ে যেটা হোমো টেনে নিয়ে যায়, আবার মাঝে মাঝে হোমোর কষ্ট হলে উর্সাস তাকে সাহায্য করেন। এটাকি গাড়ি বললে ভুল হবে কারন এটা একটা বাড়ির মতো যার মধ্যে উর্সাস থাকেন এবং তার যাবতীয় জিনিসপত্র এর মধ্যেই থাকে। সবাই তাকে হাতুড়ে ডাক্তার বলেন কারন তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে নিজের বানানো ঔষধ বিক্রি করেন এবং অসহায় মানুষদের সেবাযত্ন করেন। তার বানানো ঔষধ খেয়ে সবাই সুস্থও হয়ে উঠেন। কিন্তু কখনো সে তার গাড়ি রেখে কোথাও যান না, তার কাছে যে কোন সম্পদ আছে তাও কিন্তু না। তাহলে কেন উর্সাস চোরদের এতো ভয়পান?
একদিন সে হোমো কে নিয়ে আমেন্তিয়া গ্রামে যাবে, কারন সেখানে তার যে এক রোগী আছে তার ঔষধ না খেলে তার আর ব্যাথা কমেনা। এরই মধ্যে ফ্রান্সের বন-জঙ্গল সুন্দর রূপ ধারণ করেছে। আর এ সময়টাতে সবাই বনে বেড়াতে আসে। সেদিন আর্ডেন বাগিচায় গাড়ি নিয়ে ঢুকেছে উর্সাস, কারন বনের ভেতর দিয়ে আমান্তিয়া গ্রামে যেতে তার একদিন হলেই হবে কিন্তু বন ঘুরে গেলে তিনদিন লাগবে যা সম্ভব নয় তাকে যত দ্রুত সম্ভব সেখানে যেতে হবে। এর মধ্যে ঘটল আরেক বিপত্তি মানুষের ভীরে বনের ভেতর দিয়ে গাড়ি চালানো মুশকিল তাই সে গাড়িটাকে এক সাইডে রেখে চিন্তা করলো এখানে অনেক লোক, আমার ঔষধের কিছু প্রচারও হবে নেক বা না নেক তাতে কি। প্রথম অনেকই তার গাড়ির সামনে আসলেও ক্রমেই তা কমতে থাকলো। সবাই শুধু একটা তাবুর সামনে যাচ্ছে আর বলছে এটা কি করে সম্ভব? আর যতসব বিস্ময়সূচক শব্দ বলছে সবাই
অদ্ভুত ¡
আশ্চর্য!
আজব!
এটা কি করে হতে পারে? এমনতো দেখিনি কখনও। উর্সাস যতই কথাগুলো শুনছে তার দেখতে ইচ্ছে করছে কিন্তু গাড়ি ছেড়ে সে যাওয়ার জন্য একদম প্রস্তুত নয় সে যাই হোক। কি যে আছে তার এই গাড়ির মধ্যে সেটাই রহস্য।
একটু অন্য যায়গা থেকে ঘুরে আসি, তারপর আবার আগের যায়গায় ফিরে আসবো। ইংল্যান্ডের এক দ্বীপ, সেখানে পেমব্রোক এলাকায় অভিজাত এক জমিদারের প্রাসাদ আছে। আর্ল হলো জমিদারের উপাধি। কিন্তু সেখানে আপাতত কোন আর্ল নেই। সাবেক আর্লের একটা ছেলে ছিল বটে তবে ছোট থাকতেই হারিয়ে যায়। কোনভাবেই তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ছেলেকে হারিয়ে তার মাও আস্তে আস্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন। স্ত্রীর মৃত্যুতে আর্লও আর বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছে পোষণ করলেন না। কিন্তু তার এই বিশাল জমিদারির দ্বায়িত্ব কাউকেতো দিতেই হবে, তাই সে সে তার জ্ঞাতি এক কন্যাকে তার বাসায় এনে রাখলেন। নাম তার অ্যামেলিয়া। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিশিষ্ট আইনজীবি রেসেলকে তার জমিদারি এবং এই জ্ঞাতি কন্যার অভিভাবক হিসেবে উইল করা হলো।
আর্ল গুস্তাভের মৃত্যুর পর অ্যামেলিয়াকে দেখাশোনা জন্য একজনকে নিয়োগ করা হয়েছিল কিন্তু সবার জন্য তার আর এখানে টিকে থাকা হলো না। তাই নতুন করে মিসেস রিচেল কে দায়িত্ব দেয়া হলো এবং তার সাথে তার ছেলে ডেভিডও এই বাড়িতেই বড় হতে লাগলো। রিচেল অ্যামেলিয়াকে তেমন কিছুই শেখায় নি আর তার উদ্দেশ্যই ছিল তার ছেলে ডেভিড এর সাথে অ্যামেলিয়ার বিয়ে হলে এই বিশাল জমিদারির ভাগ তারা পাবে এবং তার ছেলে হবে আর্ল। সেভাবেই চলতে থাকলো এবং অ্যামেলিয়া বড় হয়ে গেল কিন্তু এখনো তার আঠারো বছর হয়নি তাই দায়িত্বর ভার এখনো মি. রাসেলের কাছে। এদিকে তার আর ডেভিডের মেলামেশা দেখে লোকে ভেবেই নিয়েছে তারা অতি শীগ্রই বিয়ে করতে যাচ্ছে।
অ্যামেলিয়া ইউরোপের সব দেশ ঘুরে দেখতে চায় তাই সে মি. রালেসকে বলাতে সেও সম্মতি দিল তবে সাথে সে যাবে। একথা সবাই ভালো না ল্গলেও কিছুর করার নেই। এদিকে ডেভিডের সাথে তার মা মিসেস রিচেল ইউরোপ ঘুরার এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইলেন না। সবাই প্রথমে গেল ফ্রান্সে এবং সেখানে তারা হোটেল বোর্বোতে উঠলেন। অ্যামেলিয়া এবং ডেভিডের জন্য দুইজন ভৃত্য ঠিক করা হলো। আঁদ্রে যেকিনা ডেভিড কে তলোয়ার চালানো শেখাবে আর বিঁয়াকা অ্যামেলিয়াকে নাচ-গান আরও অনেক কিছু শেখাবেন।
ডেভিড এবং আঁদ্রে একদিন রাতের বেলায় ঘুরতে বের হলো এবং ক্যাসিনো থেকে ফেরার পথে অনেক রাত হয়ে গেল তাই তারা একটি গাড়ি ভাড়া করে হোটেলে ফিরতে চাইলো। গাড়িতে উঠেই দুইজন ঘুমিয়ে পরল আর এদিকে তাদেরকে অপহরণ করা হয়েছে তার কোন খবরি নেই।
সকালেই রাসেলের কাছে একজন গিয়ে চিঠি দিয়ে আসলে এবং যাতে লিখা আছে তাকে টাকা নিয়ে কোথায় যেতে হবে যদি ডেভিড কে ফিরে পেতে চায়। আর সাথে নামটাও লিখা অ্যালরিক দ্য গথ। নাম শুনেই রাসেলের মুখ দেখার মতো ছিল কারন আইনজীবী হিসেবে অপরাধ জগতের অনেককেই চেনেন সে আর যার নাম শুনলেন সে হলো ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় ডাকাত, যাকে চেষ্টা করেও কেউ ধরতে পারেনি।
কথামতো রাসেল টাকা নিয়ে চলে গেল নদীর তীরে। যার পরিমাণ ছিল সাড়ে উনপঞ্চাশ হাজার ডলার। ঘুরতে এসে তারা মাত্র পাঁচশ ডলার খরচ করেছেন। সেখান থেকে তার চোখ বেঁধে অ্যালরিকের আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হলো। তাকে দেখেই অ্যালরিক খুশি হয়ে বসতে দিলেন এবং টাকা গুলো দেয়ার জন্য বললেন। রাসেল বললেন ডেভিড এখানে আছে তার প্রমাণ কি? অ্যালরিক বললেন আমি তাদেরকে এখনি হোটেলে পাঠিয়ে দিচ্ছি কারন আপনি এখন গেলে রাস্তায় পুলিশের সামনে পরলে শত প্রশ্নের মুখে পরবেন। অ্যালরিক ডেভিডের মুখেই শুনেছেন সে কে এবং কোথা থেকে তারা এসেছেন।
অ্যালরিক রাসেলক বলল আপনাকে একটা গল্প বলব, আমার জীবনের গল্প আশা করি আপনার কাজে লাগবে। রাসেল চিন্তায় আছে কি বলে আর তাকেই বা কেন বলবে? এদিকে আইরিন আসে একটা ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে, তাদের সাথেরি একজন মেয়েটিকে তুলে এনেছেন রাস্তা থেকে। আসার পর থেকে মেয়েটি শুধু কান্নাই করছিলেন। কান্না করতে করতেই সে আইরিনের কোলে ঘুমিয়ে পরে। আইরিন ছিল অ্যালরিকের এসিস্ট্যান্ট, তবে এসিস্ট্যান্ট বললে ভুল হবে তারচেয়ে বেশি কিছু। আইরিন রাসেলকে আসস্ত করলেন ডেভিড এবং আঁদ্রেকে হোটেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
এবার অ্যালরিক বলা শুরু করলেন তার গল্প। সে এক জমিদারের বাগান দেখার কাজ করতেন এবং মূলত কাজছিল বনের হরিণ গুলোকে দেখে রাখা যেন কেও চুরি বা হত্যা করতে না পারেন। কিন্তু কি এক মতিভ্রম হলো তার কয়েকজন সাহচার্য একদিন কিছু হরিণ মেরে ফেলল খাওয়ার জন্য। এতে করে তাদের সবার চাকুরী চলে গেল, কিন্তু সে যেহেতু সবার উপরে ছিল এবং মূল দায়িত্ব তার উপরেই ছিল তাই তাকে বিশঘাত চাবুক মারার শাস্তিও হলো। সে রাসেলকে বলছিল আপনি চাইলে এখনো দেখতে পারেন তার দাগ এখনো আমার পিঠে আছে। ছয়মাস আমি বিছানায় ছিলাম অসুস্থ হয়ে, মরে যাইনি এটাই বেশি। এরপর থেকেই আমি সেই পাশান জমিদারের উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তার ছেলেটাকে চুরি করি এবং শুধু যে চুরি করি তা না সেই ছেলর মুখের উপর এমন অপারেশন করিয়েছি যার বত্রিশ পাটি দাঁত সব সময় বেরিয়ে থাকে এবং লোকে দেখলে ভয় পায়। এখন রাসেল বুঝতে পারছেন আসলে সে তার বন্ধু গুস্তাভের কথা বলছেন এবং তার সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলে গিয়েলুমের কথা বলছেন। ডেভিডের মুখে যখন সে শুনেছে সে পমব্রোকের আর্ল হতে চলেছেন তখন থেকেই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন না কোন মতেই এটা হতে দেয়া যাবেনা। অ্যালরিক চায় পেমব্রোকের আসল মালিক তার যায়গা ফিরে পাক এবং যখন সে লর্ড সভায় বসবে লোকে তার চেহারা দেখে হাসবে এবং তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে এতেই তার প্রতিশোধ নেয়া হবে।
বন্ধুর বিশ্বাস রক্ষায় রাসেল এখন চিন্তা করতে লাগলেন কি করবেন এবং সে অ্যালরিককে জিজ্ঞেস করলেন গিয়েলুম এখন কোথায়? অ্যালরিক বললেন অনেকদিন সে তার সাথেই ছিল কিন্তু এক জাদুকর এসে তাকে নিয়ে গিয়েছেন তাকে দেখিয়ে টাকা কামানোর জন্য কিন্তু সে তাদের তাবুতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছে।
অ্যালরিক তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য এবং বলতে গেলে তার জীবনদাতা সেই হাতুড়ে ডাক্তারের কথা কখনও ভুলবেন না। কিভাবে তাকে ফেলে রেখে যাওয়ার পর সে তার সেবাযত্ন করেছেন এবং তাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। গ্রামের পর গ্রাম সে ঘুরেছেন ডাক্তারের সাথে। এক আজব ধরনের লোক। সব সময় মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন এবং নিজের সাথে থাকা নেকড়েটাকেও সে আদর যত্নে আগলে রেখেছেন। এমনই সময় রাসেলের এক সহচরী এসে বললেন উর্সাস নামে একজন এসেছেন, সেকিনা ডাক্তার এবং আপনার চিকিৎসা করেছেন। অ্যালরিক মনে হয় নিজেরর কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সে উর্সাসকে পেয়ে কি করবে নিজেই বুঝতে পারছেন না। আজকে উর্সাস এসেছে তার কাছে বিচার নিয়ে। কিভাবে মানুষ এতো নিষ্ঠুর হতে পারেন একটা ছেলের জীবন নষ্ট করে দিয়েছে তার চেহারার উপর অপারেশন করে। উর্সাস জানতো না যার কাছে বিচার নিয়ে এসেছেন সে নিজেই অপরাধী। যখন থেকে অ্যালরিকের মেয়েটা মারা গেল তখন থেকে সে আর কোন বাচ্চাদের অপহরণ করেন না।
সবকথা শুনে উর্সাস বলল একজন বাবার প্রতি প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তুমি তার ছেলের জীবনটা নষ্ট করে দেবে তাও এভাবে। যে অন্যয় করেছেন তুমিও যদি তাই কর তাহলে আর সেখানে পার্থক্য কি থাকে। উর্সাসের কথা শুনে অ্যালরিক লজ্জায় কিছু বলতে পারেনা। উর্সাসের সাথে কথা বলার পর রাসেল, উর্সাস এবং অ্যালরিক মিলে কথা বলেন কিভাবে গিয়েলুমকে তার উত্তরাধিকার ফিরিয়ে দেয়া যায়, কিন্তু তার জন্যতো প্রমাণ লাগবে। ঐ যে বলেছিলাম না উর্সাস গাড়ি ছেড়ে কোথাও যায়না তার কারন অ্যালরিক তাকে একটা পুটলি দিয়েছিল এবং যার মধ্যে গিয়েলুমের পরিচয় পাওয়ার জন্য সবকিছু ছিল। সে যখন সুস্থ হয়ে চলে আসে তখন সে উর্সাসের কাছে এগুলো রেখে আসেন আর এতোদিন তাই উর্সাস দায়িত্বের সাথে নিজের কাছে রেখেছেন এগুলো যত্ন করে। আজ সে তা রাসেলকে দিয়ে বললেন আপনি এখন এই পুটলির দায়িত্ব নিতে পারবেন। রাসেল বলল আমি চেষ্টা করছি আপনি গিয়েলুমকে দেখে রাখবেন। আর সেই যে ছোট্ট মেয়েটা আইরিনের কাছে ছিল অ্যালরিক তাকে উর্সাসের সাথে দিয়ে দিল কারন একমাত্র সেই পারবে তাকে উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।
এবার আসি আগের যায়গায় উর্সাস হোমোকে নিয়ে যাচ্ছিল, সে দেখলো তাবুতে আগুন লেগেছে এবং সে সবকিছু ফেলে সেই আগুন নেভানোর জন্য ছুটে গেল কিন্তু ইতিমধ্যে যা হওয়ার হয়ে গেল। এই প্রথম উর্সাস তার গাড়ি রেখে কোথাও গেল। যখন সে ফিরল সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলো না কি দেখছে সে, এমনকি মানুষ হয় মনে হচ্ছে যেন সব সময় হাসছে এবং চেহারা দেখতেও কেমন ভয়ংকর। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার জন্য সে বুঝতে পেরেছিল কি হয়েছে এই বালকের সাথে। গিয়েলুম তাকে দেখেও চোখ ফেরাতে পারেনি কারন সে এমন মানুষ দেখেনি অদ্ভুত ধরনের তাই সে দৌঁড়ে পালাতে চাইলো কিন্তু উর্সাস তাকে যেতে দিল না এবং বুঝালো তার সাহায্য দরকার এভাবে পালিয়ে সে বাঁচতে পারবেনা।
ফ্রান্সে যাওয়ার আগে গিয়েলুম এবং হোমোর দায়িত্ব এক গোয়ালাকে দিয়ে গিয়েছিল উর্সাস এবং সেও তার দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করেছেন। যখন বাচ্চাটাকে নিয়ে উর্সাস ফিরে আসলো তখন গিয়েলুম তাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিল মনে হচ্ছিল একটা পরি, তবে এটাই ভয় পাচ্ছিল বাচ্চাটা তাকে দেখে ভয় পাবেনাতো, না দেখা গেল তার উল্টো সেই বাচ্চা দৌঁড়ে তার কাছে চলে আসলো এবং হাসতে লাগলো। উর্সাস তার নাম দিল ডী। তার সাথেই খেলে গিয়েলুমের দিন কাটে এবং সে তার আগের সবকিছু ভুলে যায় কি কষ্টই না তাকে জাদুকর দিত। তাকে ইচ্ছে করে কাঁদাতো কারন সে কাঁদলেও মনে হতো হাসছে। সেই নিষ্ঠুরতা থেকে সে মনে হয় স্বর্গে এসে পরেছে। কখনো পিন ফুট করে দিত তার গাঁয়ে কখনও গরম কিছুর ছেকা লাগিয়ে দিত। অদ্ভুতাকার এই চেহারা দেখে তারা মজা নিত।
উর্সাস এই বালকের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে বিচলিত কি হবে তার ভাগ্য। সে যদি সব ফিরেও পায় তাও কি সবাই তাকে মেনে নিবে। এই নিষ্ঠুর সমাজের এক প্রতিহিংসা ছেলেটার জীবনটাই নষ্ট করে দিয়েছে, কি কষ্টটাই না সে পাচ্ছে। তাই সে চিন্তা করলো তাকে অবশ্য এই বালকের জন্য কিছু করতে হবে, কিন্তু কি করবে। সবকিছু ভেবে সে চিন্তা করলো শিক্ষার চেয়ে বড় কিছু নেই যদি সে গিয়েলুমকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারেন তাহলে সে তার অধিকার ফিরে না পেলেও তার শিক্ষা দিয়ে কিছু একটা করতে পারবে। তার গাড়িটা গোয়ালের বাড়ি থাকতেই সেটা দুতলা করা হয়েছে যেখানে গিয়েলুম থাকে, তাই এর ওজনও বেড়েছে তাই সে চিন্তা করেছে যদি হোমো এটা না টানতে পারে তাহলে হোমোর আরেকজন সঙ্গী খুঁজা হবে এবং তার বাম হবে লোম। লোম অর্থ “ভুত”।
দোতলায় উঠেই সেই পুরনো এক বাক্স খুলল সেখানে ছিল অনেক রকমের বই। নিজের আগের দিনগুলো তার মনে হলো। সসবকিছু ছেড়ে কিভাবে সে বনের পর বন এবং গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষের সেবা করে জীবের সেবা করে। কিন্তু এই বই গিয়েলুমের কোন কাজে আসবে না কারন সেতো অক্ষর পর্যন্ত জানেনা এই বইগুলো পড়ার প্রশ্নই উঠেনা। তাই সে গ্রামে ঢুকেই ঔষধ বেঁচা শেষ করে বইয়ের দোকানে গেলেন এবং কিছু বই কিনে নিলেন বাচ্চাদের। সে গিয়েলুমকে সঠিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে চান এবং এমন একজন দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান যেন তার গর্ব হয়, তাই সে তার শিক্ষকতা জীবনের সব অভিজ্ঞতা তার জন্য প্রয়োগ করবেন। বইগুলো দেখে গিয়েলুম প্রথম ভেবেছিল এগুলো ডী এর খেলার জন্য কিন্তু যখন বলা হলো এগুলো তার এবং আজ থেকে সে পড়াশোনা শিখবে, কথা শুনে সে অবাক জীবনে এক অক্ষরও সে পড়েনি শুধুমাত্র তাকে দিয়ে টাকা কামানোর জন্যই তাকে যা শেখানো হয়েছিল তাই। প্রথম প্রথম তার পড়তে অনিচ্ছা হলেও আস্তে আস্তে সে পড়তে পছন্দ করলো।
ঐদিকে রাসেল ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়েছেন এবং সবাইকে বলে গিয়েছেন জরুরী কাজে তাকে ফিরতে হয়েছে সবাই যেন ফিরে আসেন আর কোন নতুন যায়গায় ঘুরতে যাওয়া হবেনা। সেই চিঠি পেয়ে রাচেল এবং অ্যামেলিয়া রেগে আগুন, কিন্তু কিছু করার নেই রাসেলের অনুমতি ছাড়া কোন টাকাই তারা ব্যাংক থেকে নিতে পারবেনা। রাসেল সেখানে গিয়েই পেমব্রোকের প্রাসাদে যান এবং তাকে একা দেখে সবাই অবাক হক কিন্তু কেউ প্রশ্ন করতে সাহস পাননি। রাসেল সরাসরি তার বন্ধু যেখানে বসে সব কাগজপত্র লেখালেখি করতেন এবং সব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রাখা থাকতো তা খুঁজে দেখতে শুরু করলেন। কিন্তু কোথাও কিছু পেলেন না একটা কাগজ উল্টাতে উল্টাতে একদম শেষে দেখলেন অনেক গুলো দাগ এবং নিচে লিখা তার বন্ধুর হাতে আমার ছেলে গিয়েলুমের তিন বছর কালের আঙুলের ছাপ। ঠিক উপরে তাকিয়ে দেখেন বাম হাতের পাঁচ এবং ডান হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপ। এরকম কিছুই সে খুঁজছিলেন। সে এই খাতা নিয়ে আবার ফ্রান্সে ফিরে গেলেন কারন এখন গিয়েলুমের হাতের সাথে এগুলো ছাপ মিলে গেলেই প্রমাণ হয়ে যাবে সে কি সত্যি তার বন্ধুর ছেলে না কি। রাচেল সবাইকে নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়েছেন বিঁয়াকা গেলেও আঁদ্রে যায়নি কারন ডেভিড একেতো কোন কাজের না তার উপরে ইংল্যান্ডে কেও এখন তলোয়ার চালানো শিখতে চায়না তাই শুধু শুধু চাকরি চলে গেলে সে কি করবে তাই রয়ে গেল। রাসেল কে ফিরে আসতে দেখে সে অবাক আর সেদিনের হোটেল ভাড়া দেয়া ছিল তাই সে রাতে থেকে সকালে চলে যাবেন। রাসেল এসেও সেই রুমেই উঠলো কিন্তু আঁদ্রে কেমন জানি সন্দেহ করছিল কিছু একটা আছে নয়তো কেন সে আবার ফিরে আসলো। তার মাথায় বুদ্ধি আসলো যদি সে এর রহস্য বের করে অ্যামেলিয়াকে জানাতে পারে তাহলে অবশ্যই সে কিছু পাবে। তারপর থেকে সে রাসেলের উপর নজর রাখা শুরু করে দিল।
এদিকে বনের মধ্যে থেকে গিয়েলুম যে শুধু শুধু সময় পার করছেন তা না সে পড়াশোনায় এতোই মনোযোগী হয়ে উঠেছেন যে তাকে আর পড়ার কথা বলতে হয়না। সব দিক থেকে নিজেকে গড়ে তুলছেন এবং উর্সাসের সাথে তার ঔষধ বানানোর প্রক্রিয়াও আয়ত্ত করছেন।
অ্যালরিকের আস্তানে খুঁজে রাসেল উর্সানের ঠিকানা খুঁজে বের করলো এবং এক সময় সে উর্সাসের এখানে এসে পৌঁছালো। এই প্রথম সে গিয়েলুমকে দেখলো। তাকে দেখার পর সে আর কিছু বলতে পারছিল না কিন্তু কি করার যদি এই হয় তার বন্ধুর ছেলে তাহলে অবশ্যই তাকে তার পাওনা ফিরিয়ে দেয়া তার দায়িত্ব। সে উর্সাসকে খাতাটা দেখালো এবং সব খুলে বলল। এখন গিয়েলুমকে নিয়ে একবার ফ্রান্সে যেতে হবে, কিন্তু ডী আর হোমো কে কোথায় রেখে যাবে তাই তাদেরকেও সাথে নিয়ে গেল। এদিকে আঁদ্রে ছদ্মবেশে রাসেলের পিছু নিতে নিতে উর্সাসের এখানে চলে আসলো এবং বুঝতে পারলো অবশ্যই রাসেল কিছু একটা ষড়যন্ত্র করছে।
তারা সবাই অ্যালরিকের এখানে গেলে গিয়েলুমের হাতের ছাপ নেয়া হলো এবং তা খাতার ছাপের সাথে মিলিয়ে দেখা হলো হুমহু মিলে যাচ্ছে তবুও বলল আরও কয়েকজন বিশিষ্ট জিনকে দেখিয়ে নিতে। আইরিন ডী কে পেয়ে অনেক খুশি এবং উর্সাস চাইলো তাকে দিয়ে দিতে কিন্তু অ্যালরিক বলল না আপনার কাছে থেকেই মানুষ হবে ডী। উর্সাস রাসেলকে বলল প্রকৃতির প্রতিশোধ বুঝলেন যখন অ্যালরিক নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিল। রাসেল ফ্রান্সে যেয়ে আরও কয়েকজনকে দেখালো এবং তারাও একমত হলেন, হাতের ছাপগুলো হুবহু মিল আছে।
আঁদ্রে ইংল্যান্ডে যেয়ে অ্যামেলিয়াকে সব বলল রাসেল তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেনে এবং কাউকে এই জমিদারির উত্তরাধিকারি বানাতে চাইছেন। রাসেল ফিরতেই রিচেল তালে বলল কি করছেন আপনি এসব। রাসেল মামলা করে দিলেন যে গুস্তাভের হারানো ছেলে ফিরে এসেছেন। রেচেলও তার আইনজীবী বন্ধুকে দিয়ে তার বিপক্ষে লড়তে রাজি করলেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন রাসেল প্রমাণ করতে পারবেন না। উইলে লিখা ছিল যদি গুস্তাভের ছেলে ফিরে আসে তাহলে সে এই জমিদারির আর্ল হবে কিন্তু তাকে অ্যামেলিয়াকে বিয়ে করতে হবে, কিন্তু যদি অ্যামেলিয়া বিয়েতে রাজি না হন তা হলে সে কিছুই পাবেনা আর যদি গিয়েলুম তাকে বিয়ে করতে রাজি না হন তাহলে জমিদারির অর্ধেক পাবে অ্যামেলিয়া।
বছরের পর বছর চলতে থাকলে এই মামলা। সাত বছর পর এই প্রথম অ্যালরিক আর আইরিন ইংল্যান্ডে এসেছেন। একমাত্র অ্যালরিক জানেন গিয়েলুম গুস্তাভের হারিয়ে যাওয়া ছেলে। সে জানতো সে এখানে আসলে তার সব ফাঁস হয়ে যাবে তাই সে প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন জেল ফাঁসি যাই হক সে মেনে নেবেন। অ্যালরিকের কথা এবং গুস্তাভের সেই খাতার হাতের ছাপার সাথে সবকিছু মিলে গেল। রায় গিয়েলুমের পক্ষে গেল এবং অ্যালরিকের তিন বছরের জেল হল।
সবদিক বিবেচনা করে অ্যামেলিয়া গিয়েলুমকে বিয়ে করতে রাজি হন কিন্তু মন থেকে না কারন সে ডেভিড কে বিয়ে করবেন শুধু জমিদারি পাওয়ার জন্য তার এই চাল। একদিন লর্ড সভা বসল এবং সবাই অনেক হাসাহাসি করলো গিয়েলুমকে দেখে। এখন পেমব্রোকের নতুন আর্ল গিয়েলুম। যখন তার বক্তব্য দেয়ার সময় হলো তখন তার বাচনভঙ্গি দেখে সবাই চুপ এবং তার জ্ঞান, দক্ষতা, কৌশল সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছিল কিন্তু যেই তার বক্তব্য শেষ হলো আবার সবাই হাসতে লাগলো।
সেইদিন যে লর্ড সভা থেকে গিয়েলুম বের হয়েছে আর কখনো ফিরে যায়নি। সে আবার উর্সাসের কাছে চলে যান। সেখানে ডী, উর্সাস এবং হোমোর সাথে তার বেশ কেটে যায়। কারন এরা সবাই তাকে পছন্দ করে এবং তাকে দেখে হাসেনা। গিয়েলুম অ্যামেলিয়াকে বিয়ে করবেনা বলে দেন যার ফলে জমিদারির অর্ধেক পায় অ্যামিলিয়ার কিন্তু তাকে বিয়ে করে ডেভিড খুশি নন কারন সে আর্ল হতে চেয়েছিল, কিন্তু কিছু করার নেই এক সুন্দর চেহারা ছাড়া তার আর কোন যোগ্যতা নেই কিছু করে খাওয়ার তাই তাকে অ্যামিলিয়ার টাকার উপরেই চলতে হবে।
গিয়েলুমের উর্সাসের সব বই পড়া শেষ এখন সে নতুন নতুন বই পড়ে দিন কাটাচ্ছে। ঔষধ বানিয়ে তা বিক্রি করে তাদের চলে যায়। জমিদারির যে খাজনা হয় রাসেল তার কাছে পাঠিয়ে দেন কিন্তু গিয়েলুম সে টাকা গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেন। উর্সাসের এখন একটাই কাজ বাকি, ডী কবে বড় হবে তার সাথে গিয়েলুমের বিয়ে দেবে। প্রকৃতিই গিয়েলুমকে উর্সাসের সাথে মিলিয়ে ছিল।
কিন্তু কেউ কখনও জানতেই পারলো না কেন উর্সাস এই জীবন বেছে নিল?
কিশোর ক্লাসিক বইগুলো চিন্তাধারাই পাল্টে দেয়। আমরা সব সময় প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মুখিয়ে থাকি কিন্তু তার জন্য কতটা ক্ষতি করছি সেই দিকটা খেয়াল রাখিনা। আর মানুষ নিজের স্বার্থ লাভের জন্য কি না করে। তবে আমরা প্রকৃতির প্রতিশোধ ভুলে যাই।
![]()

