বইটা প্রথমে পড়েছিলাম আমি স্কুলে থাকতে, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের অনুবাদ ছিল সেটা। আজ আবার পড়লাম আমার সংগ্রহে থাকা অন্য একটা প্রকাশনীর বই থেকে।
১৮৫২ সালে বই টি প্রকাশিত হয়েছিল এবং আমেরিকায় দাসপ্রথার পক্ষে বিপক্ষের লোকদের মাঝে শুরু হয়েছিল তুমুল বিদ্রোহ আর গৃহযুদ্ধ। আর এর যের ধরেই ১৮৬৫ সালে আমেরিকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দাসপ্রথাকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করতে বাধ্য হয় সরকার। রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিঙ্কন হ্যারিয়েটের সাথে দেখা হওয়ায় তখন রহস্য করে বলেছিলেন,
“এই সেই ছোট্ট মহিলা, যে একখানা বই লিখে দেশে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছিলেন।”
অবাক করার মতোই, তাই না?! একটা বই এর ক্ষমতা কতখানি তা আমরা এই ইতিহাস থেকেই বেশ বুঝতে পারি। দাসপ্রথার যে নির্মমতা এই বই এ বর্নিত হয়েছে, তা পড়ে বেশ উপলব্ধি করা যায় কতটা কঠিন আর অসহ্য ছিল দাসদের জীবন। ওদেরকে পশুর থেকেও অধম মনে করা হত, সারা দিন খাটুনি আর রাতের বেলায় চাবুক মেরে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে রাখা হত। ক্রীতদাসদের যেন কোনো জীবন থাকতে নেই, প্রানহীন দেহ শুধু খেটে যাবে তাদের জন্য তাই ভাবা হত।
আঙ্কেল টমস কেবিন কে ‘টম কাকা’ নামে ডাকা হত মিস্টার শেলবির বাড়িতে। এই বাড়িতে থাকা দাসরা সবাই সুখেই দিন কাটাত। আঙ্কেল টমও কাজের পর সন্ধ্যায় নিজের ঘরে বসে ধর্ম চর্চা করতেন আর ছোট্ট শেলবির কাছ থেকে অক্ষর শিখতেন। কিন্তু হঠাৎ শেলবির টাকার সমস্যা দেখা দিল এবং তিনি অপারগ হয়ে টম কে বিক্রি করে দিলেন। এরপর টমকে এক ছোট্ট মেয়ের অনুরোধে ওর পরিবার কিনে নেয়, সেখানেও টম ভালোই ছিল। কিন্তু বিপত্তি বাদে যখন টম এর মালিক এবং যে ছোট মেয়েটা অসুস্থ হয়ে মারা যায়। টমের মালকীন এইবার টম কে বেঁচে দেয় জঘন্য এক তুলা ব্যবসায়ীর কাছে, যেখানে গিয়ে ওর সইতে হয়েছিল অমানুষিক নির্যাতন। এই নির্যাতন সইতে না পেরেই একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সবার ভালোবাসার টমকাকা, আর সেদিনই আগমন ঘটে ছোট শেলবির, সে টাকা নিয়ে এসেছিল টমকাকা কে আবার কিনে ফিরিয়ে নিতে ওদের কাছে। কিন্তু টম কাকা তো অন্য কারো দ্বারা মুক্তির আগেই চিরকালের জন্য মুক্তি পেয়ে গেছে তার দাসত্ব থেকে। টম কাকারা নিগ্রো দাস, কালো বলেই তাদের জীবনের এই নির্মম পরিণতি হয়েছিল, কিন্তু টম কাকার ভেতরটা ছিল মনুষত্বের আলোয় উদ্ভাসিত। প্রতিদিন কাজের পর সন্ধ্যায় সব দাস দের নিয়ে ধর্ম চর্চা আর নীতি গল্পে মেতে উঠতেন তিনি, তার গল্পের মাধ্যমে যে শিক্ষাগুলো উঠে এসেছে সেগুলোই তুলে ধরছি-
* যে কথা সত্য নয়, সেই কথা বললে অন্যের ক্ষতি হয়। কিন্তু তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় সেই লোকের, যে লোক সেই মিথ্যা কথাটা বলে।
* কখনো অহংকার করোনা। অহংকার যেন একটা আগুন, যে করে তাকেই ছাড়খার করে দেয়। অর্থ সম্পদ, গায়ের শক্তি আর বুদ্ধি সবই ক্ষনস্থায়ী, তাই সেসব নিয়ে অহংকার করা অমূলক।
* নিজের খারাপ কথা কাজের জন্য অনুশোচনা করতে হবে, শোধরাতে হবে।
* যত বড়ই হোও না কেনো হতে হবে নম্র আর বিনয়ী। কারণ যে গাছে ফল ধরে সে গাছ ভারে নুয়েই পড়ে, অহংকারে উঁচু হয়ে উঠে না। তাই যার ভেতরে গুন যত বেশি, সে হবে তত বেশি নম্র আর বিনয়ী।
* দয়া পেতে হলে, দয়া করতে হবে।
* ভালোর পথ হলো আলোর পথ। তাই সব সময় ভালোর পথে চলতে হবে, খারাপ থেকে দূরে থাকতে হবে।
![]()
