“দ্য কল অব দ্য ওয়াইল্ড” জ্যাক লন্ডন

প্রানীকেন্দ্রীক চরিত্রের ভিত্তিতে লেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিশোর ক্লাসিক বলা হয় একে। ছোটদের কাছে এটা নেহাতই ‘বাক’ নামক একটা কুকুরের অভিজাত পরিবেশ থেকে বন্য হয়ে উঠার উপাখ্যান মনে হলেও, বড়দের কাছে একে একটা রূপক গল্প মনে হতে পারে, যেমনটা আমার মনে হয়েছে। প্রানী চরিত্রগুলোর আড়ালে যেন বিভিন্ন প্রকৃতির আর আচরণের মানুষগুলোকেই খুঁজে পেয়েছি আমি। ‘ডা জেকিল এবং মি হাইড’ গল্পের মতো এখানেও প্রানীচরিত্রের ভালো খারাপ দুইটা সত্ত্বার পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক।

** বাক অভিজাত পরিবারে যেমন ছিল-

বাকের জন্ম হয়েছিল এক অভিজাত পরিবারের বিরাট বাড়িতে, পুরো বাড়িতে তার একাধিপত্য ছিল। সেই অভিজাত পরিবেশ তাকে এতোটাই দাম্ভিক আর অহংকারী করে তুলেছিল যে, অন্য প্রানী তো বটেই মানুষকেও তার প্রজা ভাবত সে। পৃথিবীটা তার একটা বাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে, বাইরের জগতটা যে কতটা কঠিন হতে পারে সেই ধারনাই ছিল না তার। তার এই বাড়ির স্বাধীনতা বা কর্তৃত্ত্ব যে এখান থেকে বেরুলেই তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে ধারনাই ছিল না তার। কোনো প্রতিকূলতার স্বীকার এর আগে হয়নি বলেই সে কারো প্রতি অবিশ্বাস করতে পারত না, তাই নির্দ্বিধায় বাড়ির চাকরের সাথে চলে গিয়েছিল বাড়ির বাইরে, আর তাতেই তার জীবনের আরেক নতুন আর কঠিনতম অধ্যায় উন্মোচিত হল, যে জীবন কল্পনাতীত ছিল তার।

আমি এটা পড়তে পড়তে ভাবলাম, জীবন সত্যিই অনিশ্চত আমাদের। আজকে যে রাজা আগামীকাল তার জীবনধারনই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কাল কি হবে আমরা কেউ জানিনা, তাই যত ভালো অবস্থাই বর্তমানে থাকুক না কেনো প্রস্তুত থাকতে হবে যে কোনো প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করার জন্য। বাক যেমন অভিজাত পরিবারে থেকেও অধিক আরামে অলস হয়ে যায় নি, পানি ভালবাসত বলে দিনের বেশি সময় সাঁতার কেটে কাটাত, যা তার পেশীকে আরও মজবুত করেছে। এই শক্তশালী পেশীই তার দুর্বিষহ জীবনযাপনে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনতে পেরেছিল, তাকে নেতা হতে সাহায্য করেছিল।  আর আমরা বেশির ভাগ সময় কাছের মানুষ দ্বারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হই, তাই খুব বেশি বিশ্বাস আর নির্ভরতা থাকা উচিত না কারো উপরই।

** বাক এর নতুন জীবন-

বাক কে বিক্রি করে দেয়া হল স্লেড টানার কাজে ব্যবহার করার জন্য। নতুন পরিবেশ, নতুন মালিকের বিরুদ্ধে সে প্রথম বিদ্রোহ করে উঠল, কিন্তু বিনিময়ে তার কপালে জুটল শক্ত গদার বাড়ি। সে বুঝল এখানে বিদ্রোহ করে সে টিকতে পারবে না, আগের মতো সেই স্বাধীনতা তার আর নেই, নতুন পরিবেশে তাকে চলতে হবে নতুন নিয়মে, তাই চুপ হল সে। কিন্তু সেই লোকটাকে সে সহ্য করতে পারল না। মারার পর যখন আবার কাছে এসে মাথায় হাত বুলাতে আসে তখন সে হাত গা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দেয়। কিন্তু অন্য কুকুররা ঠিকই দেখল গদার বাড়ি খেয়েও কেমন একটু আদর পেতে মালিকের কাছে গিয়ে লেজ নাড়তে থাকে, আহ্লাদ করে গা চেটে দেয় অনেকটা পা চাটা তোষামোদি মানুষদের মতো আরকি।

সে লক্ষ্য করল ২-৩ দিন তাকে যখন কোনো খাবার দেয়া হল না তখন সে তার পুরোনো রাজত্ত্ব খুব মিস করল, যেখানে তার খাবারের কোন অভাব ছিল না। তারপর যা খাবার ওদের দেয়া হল, সেটা সব কুকুর রা এতো কাড়াকাড়ি করে খাচ্ছিল যে সে সুযোগই পাচ্ছিল না, কারন সে এভাবে খেয়ে অভ্যস্ত না। সে আরও লক্ষ্য করল। এক কুকুর আরেক কুকুরের খাবারের অংশ চুরি করে খাচ্ছে ধূর্ততার সাথে কেউ টের পাচ্ছে না। সে এগুলো দেখছিল, ভাবছিল তার অভিজাত পরিবেশে বেড়ে উঠার রীতিনীতি শৃঙ্খলা এখানে খাটবে না,তাই সে নতুন জীবনে মানিয়ে নেয়ার পদ্ধতি শিখছিল। যেখানে শুধু বেঁচে থাকাই চ্যালেঞ্জিং, সেখানে নিয়মের ভেতর থাকা, সৎ থাকা অমূলক। যেখানের যে নিয়ম সেই নিয়মেই চলতে হয়।

যখন স্লেডে নিয়ে তাদেরকে বাঁধা হল, দেখল স্লেডের পুরোনো কুকুররা স্লেড টানতে পেরে অনেকটা গর্বিত মনে করে নিজেদেরকে, কারন তারা নিজের এই কাজটাকে ভালোবেসেছিল, এই সঠিক ভাবে স্লেড টানতে পারার মাঝেই যেন তাদের জীবনের স্বার্থকতা লুকিয়ে ছিল। তাদের নেতা ছিল তখন স্পিঞ্জ, সে অন্য কুকুরদের মাঝে শৃঙ্খলা বজায় রাখত, কোনো কুকুর ফাকিবাজি করতে গেলেই তাদের কপালে জুটত স্পিঞ্জের কামড়। বাক খুব দ্রুতই সবকিছু শিখে ফেলল। সে যখন পুরোপুরি ওই পরিবেশের সাথে মিশে গেল, শক্তি, বুদ্ধি আর ধূর্ততায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেল, তখনই তার ভেতর থেকে আবার পুরোনো সেই নেতৃত্ব দেবার আকাঙ্ক্ষা বেরিয়ে এলো, আবার বিদ্রোহ করে উঠল স্পিঞ্জের বিরুদ্ধে। স্পিঞ্জও বুঝে গেল তার সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী বাক, তাই বাক কে সে দেখতে পারত না। দুজন সুযোগ পেলেই শুরু করত যুদ্ধ, বাক এদিকে আরও জঘন্য পদ্ধতির প্রয়োগ করল। স্পঞ্জের বিরুদ্ধে অন্যান্য কুকুরদের উস্কে দিল, বিদ্রোহ করে তুলল, কারন সবাইকে নেতা হিসেবে স্পিঞ্জ এতোদিন শাসন করে এসেছে। সব কুকুর স্পিঞ্জ কে ভয় পেত, আর তারাই এখন বাকের এই জঘন্য ধূর্ততায় স্পিঞ্জের মানতে চাইল না, স্পিঞ্জের শাসনের প্রতিবাদ করতে লাগল। সবাই বুঝল যে, বাক বা স্পিঞ্জের তুমুল লড়াই এ যেদিন একজন মৃত্যুবরণ করবে সেদিনই এসবের অবসান ঘটবে।

একদিন সত্যিই সেই লড়াইটা হল আর বাকের জয় হল, স্পিঞ্জ মৃত্যবরন করল। রাজা বাক তার উপযুক্ত জায়গা ফিরে পেল, রাজত্ব আদায় করে নিল।

বাকের এই ভূমিকা ঠিক মানুষদের নেতৃত্ব পাওয়ার নোংরা খেলার কথাই মনে করিয়ে দিল। তবে এটা ঠিক যেখানে সবাই নোংরামি করে অভ্যস্ত, সেখানে সাধু সেজে বেঁচে থাকা কঠিন, তাই সেখানে টিকতে হলে, নিজের আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে হলে সেরূপেই করতে হবে। বাক নেতা হল, এবং অবশ্যই কুকুরের দলে আবার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনল। নেতা হিসেবে স্পিঞ্জের চেয়েও ভালো দায়িত্ব্য পালন করল সে। আগের চেয়ে অনেক দ্রুততার সাথে তাদের স্লেড এগিয়ে চলল। স্লেড টানাকে বাকও ভালোবেসে ফেলল, পথের রাজা সে এখন।

কয়েকবারই বাকের মালিক চেঞ্জ হল, সবাই তাকে শুধু ব্যবসা জন্য, আর স্লেড টানার জন্যই ব্যবহার করল, তবে বাক অবশেষে থর্নটন নামের একজন মালিক পেল, যে তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে ছিল। বাকও সেটা বুঝেই সেই মালিকের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিল। ধীরে ধীরে বাক বন্যতার ডাকে আকর্ষন অনুভব করতে লাগল। তার মনে হতো যেন তার প্রকৃত অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে গহীন, যা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, শুধু থর্নটনকে প্রচন্ড ভালবাসত বলে ওকে ছেড়ে যেত না। থর্নটনকে ছাড়া আর কাউকে সে পরোয়া করত না।

(** থর্নটন আর বাকের সম্পর্কটা পড়ে আমার মনে হয়েছে-

যে সম্পর্কের মাঝে কোনো স্বার্থ নেই, চাওয়া পাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, বরং আছে যে কোনো সময় দূরে সরে যাওয়ার পূর্ন স্বাধীনতা ,সেই সম্পর্কগুলোর মাঝেই আসলে তৈরী হয় অদৃশ্য দেয়াল, যা হয়ত কংক্রিটের চেয়েও শক্ত আর দুর্ভেদ্য।)

তাই বাক থর্নটনকে ছেড়ে যাওয়ার কথা কখনো ভাবতেও পারত না, বনের টানে ছুটে গিয়েও আবার ফিরে আসত প্রিয় প্রভুর কাছে। সেই সম্পর্কের কি শেষ হয়েছিল থর্নটনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে!! না মৃত্যুর পরও সে বেঁচে ছিল আদিম সেই বাকের স্মৃতিতে। তাই থর্নটনের ফেলে যাওয়া স্মৃতিতেই ফিরে আসত বাক বার বার প্রভুর প্রতি তার সীমাহীন ভালোবাসার প্রমান স্বরূপ।

Loading

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *