“টেস অব দ্য ডার্বারভিল” টমাস হার্ডি

টেসের জীবনের গল্পটা পড়ে আপনার হৃদয় কাঁদবেই। মেয়েটা স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়, তারপরও ভুলক্রমে স্বপ্ন দেখে ফেলে, আর তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায় এক নিমিষেই। আপনি ভাববেন হয়ত- একটা মানুষের কপাল এতো খারাপ হয় কিভাবে!! এমন গল্প হয়ত আমাদের চারপাশে আরও অনেক ঘটছে। কিন্তু আমরা সেগুলো দেখেও অনেক সময় এড়িয়ে যাই হয়ত।  যত উন্নতই হোক না কেনো সব সমাজ, সব দেশই মেয়েদের ক্ষেত্রে কনজারভেটিব। যাই ঘটুক, অপরাধ যেই করুক দোষটা মেয়েদের কাঁধে চাপিয়েই যেন সমাজ হাফ ছেড়ে বেঁচে যায়। অনেক কথা বলে ফেললাম, এইবার টেসের জীবনে ঘটে যাওয়া করুন সে গল্পের অল্প ছবি আপনাদের চোখে একে দিতে চাই।

টেসের জন্ম মারলট গ্রামের খুব দরিদ্র এক পরিবারে, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা। হঠাৎ টেসের বাবা জানতে পারে তারা খুব অভিজাত ডার্বারভিল বংশের উত্তরাধিকারী। তাদের বংশধর সব মারা গেলেও একটা পরিবার এখনো আছে জানতে পারায়, টেস কে তার মা বাবা ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেখানে পাঠায় আত্মীয় পরিচয়ে কোনো সাহায্য পাওয়ার আশায়। ওকে দয়া করে সেখানে একটা কাজ দেয় ঠিক, কিন্তু দুর্ভাগা মেয়ে টেস, ওই পরিবারের দুশ্চরিত্র ছেলে আলেক ডার্বারভিল দ্বারা চরম সর্বনাশের স্বীকার হয়ে প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়। অনেক লজ্জা নিয়ে নিজের গাঁয়ে ফিরে আসে সে, নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করে, মা-বাবার কাছ থেকেও কোনো মানসিক সাপোর্ট সে পায় না। সন্তান জন্ম দেয়, গাঁয়ের লোক তাকে নিয়ে আড়ালে নানান মুখরোচক সমালোচনা করে বলে মনে হয় তার, প্রতি মুহূর্ত সে বাঁচে নিজের আর সন্তানের মৃত্যু কামনা করে। এক সময় অসুখে পরে ওর অভাগা বাচ্চাটাও মারা যায়। আর সে এই গাঁয়ে থাকা সহ্য করতে পারে না।

টেস পাড়ি জমায় নতুন ভাগ্যের অনুসন্ধানে। একটা গরুর ফার্মে মিল্কমেইডের কাজ পায় সে, সবকিছু ভালোই চলতে থাকে। সেই ফার্মে অ্যাঞ্জেল ক্লেয়ার নামের এক সুদর্শন, ভদ্র, সুশিক্ষিত ছেলে কাজ করত। ছেলেটা ভীষণ ভাবে টেসের প্রেমে পরে। টেসও ছেলেটাকে ভালোবেসে ফেলে, কিন্তু তার জীবনে ঘটে যাওয়া পুরোনো স্মৃতিগুলো তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে। সে ভাবে তার স্বপ্ন দেখা ঠিক না, সে একটা খারাপ মেয়ে, তার অতীত জানলে আঞ্জেল ক্লেয়ার ওকে আর ভালোবাসতে পারবে না। টেস ছেলেটা কে সব খুলে বলতে চায়, কিন্তু সেই দুর্বিষহ অতীত ভালোবাসার মানুষের কাছে বলতে বাঁধে তার। বার বার ছেলেটা ওকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, আর টেস বার বারই ওকে ফিরিয়ে দেয়। তারপরও ছেলেটা ফিরে আসে, এক সময় টেস আর নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে পেরে উঠে না, হ্যাঁ বলে দেয়। কিন্তু টেসের মনের অশান্তি দূর হয় না, অতীতকে লুকিয়ে রাখায় অপরাধবোধে ভুগতে থাকে। অবশেষে একটা চিঠিতে সে সব কথা লিখে সেটা ছেলেটার ঘরের দরজার নীচ দিয়ে রেখে আসে, কিন্তু ছেলেটা সেটা দেখতে পায় না।

আঞ্জেল ক্লেয়ারের সাথে বিয়ের মধ্য দিয়েই আবার টেসের নতুন জীবন শুরু হয়। বিয়ের পরদিন স্বামী-স্ত্রী গল্প করতে করতে আঞ্জেল ক্লেয়ার তার অতীতে ঘটে যাওয়া বাজে একটা ঘটনার কথা বলে টেসের কাছে ক্ষমা চায়, টেস ক্ষমা করে দেয় সাথে সাথে আর ভাবে তাকেও তার স্বামী ক্ষমা করে দিবে, যেহেতু ঘটনা একি। সে তার অতীতও সরল মনে স্বামীর সাথে শেয়ার করে, ক্ষমা চায়। কিন্তু হায়!! বোকা মেয়ে আবারও নিজের সর্বনাশ করল! তার স্বামী স্ত্রীর এই অতীত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না।  এতো ভালোবাসার পরও নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে গেল। দুজন দুদিকে পাড়ি জমাল আবার অজানার উদ্দেশ্যে।

তাদের এই বিচ্ছেদ দুজনের জীবনকেই আরও দুর্বিষহ করে তুলল। টেসের সাথে আবার সেই কাপুরুষ আলেক ডার্বারভিলের দেখা হলো, আর আবার সে টেস কে বিরক্ত করতে শুরু করল। এদিকে টেসের বাবা মারা যাওয়ায় আলেক সুযোগ নিল, ওর পরিবার কে অনেক সাহায্য করল টেস কে ফিরে পাবার আশায় এবং টেস সেই শয়তানের সাথে থাকতে বাধ্য হল। এর মাঝেই একদিন ফিরে এলো টেসের স্বামী, ভাবল আবার সে টেস কে ওর কাছে ফিরিয়ে নিবে। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না তার, কিন্তু কিসের বাঁধা যে তাদের বিচ্ছেদ ঘটাল, কেনো যে স্ত্রীর অতীত সে মেনে নিতে পারল না, সেটাই তাকে বিস্মিত করল। স্ত্রী কে সব সম্ভাব্য জায়গায় খোঁজ করল সে, কিন্তু টেস কে কোথাও পেল না।

অবশেষে টেসের পরিবার কে খুঁজে পেয়ে অনেক অনুরোধের পর টেসের ঠিকানা যোগাড় করতে পারল সে, আর গিয়ে দেখল টেস সেখানে শয়তান আলেক ডার্বারভিলের সাথে বাস করছে। টেস স্বামীকে দেখে বলল যে, সে ফিরে আসতে বড্ড দেরী করে ফেলেছে, আলেক বলেছিল ওর স্বামী আর কখনোই ওর কাছে ফিরবে না। স্বামী আঞ্জেল আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছিল না কোনোভাবেই, কোনো রকমে সেখান থেকে গভীর হতাশায় পালিয়ে বাঁচল, ছন্নছাড়া মানুষের মতো ধীর পায়ে রাস্তায় হাঁটতে লাগল।

এদিকে আলেক ডার্বারভিল ঘুমিয়ে ছিল, টেস গিয়ে ওকে বলল- আমার স্বামী ফিরে এসেছে, আর ফল কাটার ছুরিটা ওর শরীরে গেঁথে ফেলল। ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে, স্টেশনে গিয়ে স্বামীকে খুঁজে পেল সে। জানাল, সে এইমাত্র আলেক কে খুন করে এসেছে। টেসের স্বামী ভীষণ বিস্মিত হলো, ওর স্ত্রী এখন খুনি! তারপরও দুজন দুজনকে পেয়ে যেন সব ভুলে গেল, আগের মতো দুই কপোত-কপোতী পরস্পরের সঙ্গ উপভোগ করতে লাগল। বহুদূর চলে যেতে হবে ওদেরকে এদেশ ছেড়ে, যেন কেউ ওদের আর আলাদা করতে না পারে। কিন্তু অদৃষ্ট কি আর পিছু ছাড়ে! রাতের আঁধারে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে এক পুরনো মন্দিরের মতো জায়গায় বিশ্রামের জন্য থামল ওরা, টেস ঘুমিয়ে পড়ল আর তার স্বামী ঘুমন্ত স্ত্রীর মুখখানি গভীর ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখছিল।  এমন সময় পুলিশ ওদের কে ঘিরে ধরল চারপাশ থেকে, ঘুমন্ত টেস কে আটক করল তারা আলেকের খুনি হিসেবে।

শেষ করে মনে হলো – এমন জীবনযাপনের জন্য মানুষটার জন্ম না হলেই হয়ত ভালো হত!!

গল্পের কিয়দাংশ আমি তুলে ধরেছি, পুরো টা না পরলে টেস কে পুরোটা ফিল করা সম্ভব না কোনো ভাবেই।

Loading

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *