“বাউন্টিতে বিদ্রোহ”
১৭৮৭ সাল।
রজার বিয়্যামের বাবা রয়্যাল সোসাইটির ফেলো মারা গেলেন হঠাৎ প্লুরিসি রোগে আক্রান্ত হয়ে। একমাত্র মা-ই ছিল তার আপনজন। হঠাৎ বাবার বন্ধু জোসেফের কাছ থেকে ওর মায়ের কাছে একটা চিঠি এলো যে, ক্যাপ্টেন কুকের এক সহযোগী ল্যাফটেনেন্ট ব্লাই উনাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতে চান।
তখন রজার বিয়্যাম মাত্র ১৭ বছর বয়সের এক টগবগে যুবক বিভিন্ন ভাষা শেখায় পারদর্শী সে, খুশিই হলো ক্যাপ্টেন কুকের সহযোগীর সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়ে। ব্লাই ওদের বাড়িতে এলেন, এবং জানালেন উনি বাউণ্টি নামক জাহাজে করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তাহিতি যাবেন রুটিফলের চারা সংগ্রহ করতে এবং তাকে জোসেফ একটা দায়িত্ব দিয়েছেন তাহিতিদের ভাষা সংস্কৃতির একটা পান্ডুলিপি তৈরী করার জন্য। উনি যখন জানলেন বিয়্যাম এই ভাষা শেখার ব্যাপারে বেশ পারদর্শী তখন তাকেও সাথে নিয়ে যেতে চাইলেন। ওর মা ওকে অনুমতি দিয়ে দিলে ও ব্লাই এর সাথে পাড়ি জমালো দূর সমুদ্রের এক অজানা যাত্রায়।
“জাহাজে করে যাত্রার আগে ব্লাই এর থেকে পাওয়া তার প্রথম শিক্ষা ছিল- ” শৃঙ্খলার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।”
(এই শৃঙ্খলা যে শুধু তাদের সমুদ্র অভিযানেই দরকার তা নয়, আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে শৃঙখলা থাকতে হবে, তবেই সব কাজ সুন্দর হবে। যার যা দায়িত্ব তা শতভাগ সঠিকভাবে পালন করতে হবে, কোনো ধরনের ত্রুটি গ্রহনযোগ্য নয়।)
তবে যাত্রা শুরুর পর বিয়্যাম বুঝতে পারল যে, ক্যাপ্টেন ব্লাই মারাত্মক বদমেজাজী একজন মানুষ, ওর অত্যাচারে জাহাজের প্রতিটি মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে!!
জাহাজটি একদিন তাহিতি তে পৌঁছালো। তারা তাহিতি বাসী ইন্ডিয়ানদের সাথে উপহারের বিনিময়ে তাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু সংগ্রহ করতে শুরু করল। আর বিয়্যাম লেগে গেলো তার পান্ডুলিপি তৈরীর কাজে। সব কাজ শেষ হলে একদিন তাহিতি থেকে তারা বিদায় নিল, জাহাজ আবারও চলতে শুরু করল বিশাল সমুদ্রে। এর মধ্যে ব্লাই এর আচরণ দিন দিন খারাপ থেকে খারাপতর হতে থাকল। এক সময় আর সহ্য করতে না পেরে রাতের এক অন্ধকারে জাহাজের এক বিনয়ী অফিসার ক্রিশ্চিয়ান বিদ্রোহ ঘোষনা করল ক্যাপ্টেন ব্লাই এর বিরুদ্ধে। এতোদিন ব্লাই এর দ্বারা নির্যাতিত সকলে যেন সুযোগ পেয়ে ফুঁসে উঠলো, ব্লাইকে মেরে ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ান ব্লাই কে সুযোগ দিল লঞ্চে করে পালিয়ে যাওয়ার জন্য এবং সাথে যারা ব্লাই কে সমর্থন করে তাদেরও চলে যেতে বলল। কিন্তু ছোট লঞ্চে আর জায়গা না হওয়ায় ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বিয়্যান কে থেকে যেতে হলো বিদ্রোহীদের সাথেই।
বিয়্যাম যদিও বিদ্রোহী নয়, তারপরও তার নাম জড়িয়ে গেলো বিদ্রোহীদের তালিকায়!!
ক্রিশ্চিয়ান সবাই কে ডেকে, মতামত নিয়ে নিজে জাহাজের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব নিল এবং সে একজন বিনয়ী উপযোগী নেতা ব্লাই এর মতো যার তিক্ত শাসন করার প্রয়োজন হয় না কাউকে, তার নির্দেশ মতো এমনিই সবাই যার যার কাজ করে যাচ্ছে।
তারা বিদ্রোহ করে বাউন্টিকে দখল করেছে তাই তারা কঠিন অপরাধী। ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়া তাদের জন্য অসম্ভব এবং তাদের ধরার জন্য ইংল্যান্ড সরকার যুদ্ধ জাহাজ পাঠাবে এই ব্যাপারেও তারা সুনিশ্চিত। সুতরাং ক্রিশ্চিয়ান এমন কোনো দ্বীপে যেতে চাইল যেখানে কখনো ইউরোপীয়ান কোনো জাহাজ যায় নি। অজানা অচেনা সমুদ্রে কিছুদিন ঘুরে তারা আর কোনো উপযোগী জায়গা না পেয়ে আবার তাহিতি তেই ফিরে আসল এবং বিদ্রোহের কথাটা গোপন রাখল। তাহিতি তে ক্রিশ্চিয়ান যারা তার সাথে বিদ্রোহে যোগ না দিয়েও রয়ে গেছে, তাদের কে এখানেই রেখে বাউন্টি নিয়ে আবার পাড়ি জমালো অজানা সমুদ্র পথে।
তাহিতি তেই তাও রয়ে গেলো বিয়্যাম, এখানে এসে সে আবার শুরু করল তার পান্ডুলিপি তৈরীর কাজ, প্রেমে পড়ে বিয়ে করল এক গোত্রপতির ভাতিজিকে। তাদের একটা ফুটফুটে মেয়েও হলো। ভালোই চলছিল সবকিছু। হঠাৎ তাহিতিবাসী এক জাহাজের আগমন প্রত্যক্ষ করল, বিয়্যাম দ্রুত ক্যানো নিয়ে পৌঁছালো সেই জাহাজে, এবং বন্দী হলো বাউন্টির বিদ্রোহী হিসেবে। শুনতে পেলো ক্যাপ্টেন ব্লাই সেই ছোট্ট লঞ্চে করেই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইংল্যান্ডে পৌঁছেছিলেন এবং বিয়্যামকেও একজন বিদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বিয়্যামকে স্ত্রী সন্তানকে তাহিতি তে ফেলেই এক বিদ্রোহী বন্দী হিসেবে পাড়ি জমাতে হলো ইংল্যান্ডে এবং যেসব ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রমান করত যে, বিয়্যাম বিদ্রোহী নয় তাদের কেউ সেদিন বেঁচে ছিল না!!! দেশে ফিরেই শুনতে পেলো কিছুদিন আগেই তার মা মারা গিয়েছে!
কতটা পীড়াদায়ক এই অনুভূতি!! দুইজন নারীকে বিয়্যাম ভালোবেসেছিল জীবনে, একজনকে ফেলে আসতে হলো পৃথিবীর অন্যপ্রান্তের এক দ্বীপে যার সাথে আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনাই নেই, আর এরেকজন ছেড়ে চলে গেলো চিরকালের জন্য।
অনেক চেষ্টার পরও বিয়্যামের মৃত্যুদন্ডাদেশ দিল আদালত উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে। কিন্তু আদেশ কার্যকর হওয়ার আগেই সৌভাগ্যক্রমে দেশে ফিরল বিয়্যামকে নির্দোষ প্রমান করার মতো একজন সাক্ষী এবং মুক্তি পেলো বিয়্যাম। কিন্তু বেঁচে ফিরলেও দেশে তার কোনো পিছুটান না থাকায় আবারও তাহিতির উদ্দ্যেশ্যে পাড়ি জমাতে চাইল সে, কিন্তু বিদ্রোহী খেতাব থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় সে যোগ দিল সৈনিক হিসেবে এবং দেশের হয়ে যুদ্ধ করে কাটিয়ে দিল ১২টি বছর। এরপর তার জাহাজ একদিন তাহিতি তে পৌঁছালো, কিন্তু তাহিতির সেই আগের প্রানচঞ্চলতা দেখতে পেলো না। তাহিতি যেন জনমানবশূন্য এখন। কি এক রোগে আক্রান্ত হয়ে তাহিতির অর্ধেকের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, খোঁজ নিয়ে জানল তার স্ত্রী অনেক আগেই মারা গেছে, আর মেয়ে আজ পূর্ণবয়স্ক তরুণী, বিয়ে করেছে, দুটো বাচ্চাও আছে। মেয়েকে সে দেখল ঠিকই কিন্তু এতো বছর পর বাবার পরিচয়ে সামনে দাঁড়াতে বাঁধলো তার!!
গল্পটা শেষ করে আমার ভেতরটা কেমন শূন্যতায় ভরে গেছে!!!
![]()
