ভীষণ ব্যস্ত একটা দিন কেটেছে। সকালেই ফরাসী লেখক ভিক্টর হুগোর “লা মিজার্যাবল” পড়ে শেষ করেছিলাম, কিন্তু আর লেখার সময় করে উঠতে পারিনি। এটা নিয়ে আমার আগের দুইটা পোস্ট যারা পড়েছেন তারা গল্পের অনেকখানিই জেনে ফেলেছেন, তাদের জন্যই এর একটা প্রপার ফিনিশিং দেয়া দরকার।
জাঁ ভ্যালজাঁ আর মঁসিয়ে মাদেলিন দুইটা চরিত্রের কথা আমার গত দুই পোস্টে উল্ল্যেখ করেছিলাম।
মঁসিয়ে মাদেলিন ছিলেন এম শহরের একজন মহানুভব ব্যাক্তিত্ব, যিনি খুঁজে খুঁজে অভাগা লোকজন দের দুঃখ দুর্দশা দূর করার চেষ্টা করতেন। মানুষ তাকে ভালোবেসে শহরের মেয়র পদে নির্বাচিত করে। সবাই মাদেলিন কে অন্ধের মতো বিশ্বাস করলেও একজন ওকে মনে প্রানে সন্দেহ করে, সেই লোকটা এম শহরের সৎ পুলিশ অফিসার, যে কিনা জীবনে কোনো অন্যায় কে প্রশ্রয় দেয় নি, আইনের ব্যাপারে মারাত্মক কড়া সে।
জাঁ ভ্যালজাঁ বিশপের কাছ থেকে পাওয়া রূপার থালা বাসন নিয়ে চলে যাবার পর আরেকটা ছোট্ট অপরাধ করে ফেলে নিজের অজান্তেই, আর এর জন্য পুলিশ অফিসারটা ওকে বছরের পর বছর খুঁজে বেড়ায়, এবং সন্দেহ করে যে, এই মাদেলিনই সেই জাঁ ভ্যালজাঁ!! সে সুযোগের সন্ধ্যানে থাকে মাদেলিন কে ধরার জন্য! ঘঘটনাক্রমে আরেক লোক কে বাঁচাতে মাদেলিন নিজেই তার পরিচয় জনসম্মুখে উন্মোচিত করে।
সত্যিই সে জাঁ ভ্যালজাঁ, যে এম শহরে এসে প্রথমে শ্রমিকের কাজ করে, তারপর তার মেধা খাটিয়ে বিশপের দেয়া রূপোর থালা বাসন বিক্রি করে পুঁতির কারখানা কিনে নিয়ে মস্ত ধনী আর অসম্ভব দয়ালু ব্যাক্তি হয়ে উঠেছিল, যাকে কেউ আর ১৯ বছর জেল খেটে আসা দাগী আসামী ভাবতে পারত না কেউ। অবশেষে ওর পরিচয় জানতে পেরে পুলিশ অফিসার তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে আজীবনের জন্য সশ্রম কারাবাসে দন্ডিত করে, আবার এই বৃদ্ধ বয়সে শুরু হয় জাহাজে জাঁ’র দাড় টানা এবং একদিন সুযোগ পেয়ে জাহাজ থেকে সমুদ্রে লাফিয়ে পরে আবার পালায় সে।
এর মাঝে আবার মাদেলিনের সাথে দেখা হয়েছিল এক ফাঁতিন নামক এক অসহায় নারীর, যে তার একমাত্র মেয়ের দায়িত্ব ভার এক ধূর্ত লোকের হাতে অর্পন করে এসেছিল মাসে মাসে টাকা পাঠাবে এই শর্তে, সেই লোক আর ওর স্ত্রী ফাঁতিনের মেয়ে কোজেৎ কে দাসীর মতো খাটাত। ফাঁতিন কে মাদেলিন কথা দিয়েছিল যে, ওর মেয়ে কোজেৎ কে সে নিয়ে আসবে সেই লোকটার কাছ থেকে। এর মাঝেই ফাঁতিনের মৃত্যু হয় মাদেলিন কে আবার গ্রেফতার করার দিনেই।
মাদেলিন তাই জাহাজ থেকে পালিয়ে প্রথমেই কোজেৎ কে মুক্ত করে আনতে যায়, এবং নিয়ে আসে ওর কাছে। কোজেৎ কে নিয়ে এই মাদেলিন/জাঁ ভ্যালজা পাড়ি জমায় আরেক নতুন জায়গায়, নতুন পরিচয়ে। এক সময় কোজেৎ বড় হয়, প্রাপ্ত বয়স্ক তরুনী হয়, প্রেমে পরে এক বিপ্লবী তরুণের। এই বিপ্লবী তরুণ এক বিদ্রোহের সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়, আর জাঁ ভ্যালজাঁ ওকে রক্ষা করে কোজেতের কথা ভেবে। ছেলেটার সাথে কোজেতের বিয়ে হয়ে যায়, আর জাঁ ভ্যালজাঁ ওর জীবনের সব কাহিনী কোজেতের স্বামীকে শুনায় শুধু ও যে ওকে বাঁচিয়েছিল এই কাহিনী বাদে। সব শুনে কোজেতের স্বামীও একজন কয়েদী হিসেবে ভ্যাঁলজা কে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করে!! এমন পরিস্থিতি এক সময় তৈরী হয় যে, ভ্যাঁলজা কোজেৎ কে দেখতে যেতেও পারেনা। এই দুঃখী, কিন্তু অসম্ভব মনোবলের অধিকারী এই লোকটাও এতে মুষড়ে পরে খুব, অসহায়ত্ব ওকে শেষ বয়সে অসুস্থ করে দেয়, একাকী বিছানায় পরে কাতড়াতে থাকে!! ঠিক ওই সময় কোজেতের স্বামী জানতে পারে যে, বিপ্লবে প্রায় মরতে বসা তাকে এই জাঁ ভ্যালজাঁই বাঁচিয়েছিল। এটা শুনে সে অনুতপ্ত হয়, তৎক্ষনাৎ কোজেৎ কে নিয়ে ভ্যালজাঁর কাছে যায়, ক্ষমা প্রার্থনা করে আর ভ্যালজাঁ জীবন প্রায়ান্ন্যে ওদের দেখতে পেয়ে অবশেষে পরম শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে!!
গল্পটা কাঁদতে বাধ্য করে!! দুঃখের পর সুখ আসে, এটা সবার ক্ষেত্রে সত্য হয় না। কিছু লোকের জন্য সুখ সে তো মরীচিকা!!
তবে যাই হোক, জাঁ ভ্যালজাঁ চির দুঃখী কিন্তু কখনো হার না মানা এক চরিত্র, গল্পের পরতে পরতে তার মহানুভবতা আর দায়িত্বশীলতারও অনেক পরিচয় পাওয়া যায়।
আমার আরেকটা উপলব্ধি হলো- পৃথিবীর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের সমাজ ব্যবস্থাই দায়ী এর সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর খারাপ হওয়ার পেছনে! কোনো মানুষ খারাপ বা অপরাধী হিসেবে জন্মায় না, তাকে এই সমাজই অপরাধী হিসেবে গড়ে উঠতে মদদ জোগায়!
সমাজের মানুষগুলো যদি সহজেই ঘৃণার বদলে সহজেই ভালোবাসায় জড়াতে পারত তবে হয়ত জাঁ ভ্যালজাঁ দের জীবন এভাবে শুধু দুঃখ পেয়ে কাটত না।
আর আইন!!! যত দুঃখী আর অসহায় লোকদের ক্ষেত্রে যেন আইনের হাত একটু বেশিই লম্বা হয়ে যায়!! আমি ভাবছি তৎকালীন ফরাসী আইনের এক সিঁকি ভাগ কঠোরতাও যদি আমাদের দেশের আইন প্রণয়নে থাকত, তাহলে দেশটা কিছুটা হলেও বদলাত বৈ কি!! তবে সবকিছুর সমাধান আইন করতে পারে না এটা স্পষ্ট, কিছু বিচার মনুষ্যত্ব বোধ দিয়েও করতে হয়।
![]()
