(একটা চিঠির গোপনীয়তা রক্ষা করা নিয়ে পুরোটা গল্প, আর গল্পের ভিলেনের নামে এর নামকরণ করা হয়েছে!!)
ছোট্ট একটা দেশ রুরিতানিয়া, রাজা ৫ম রুডলফের রাজ্য অভিষেক হবে এখানে। এক ইংরেজ যুবক র্যাসেনডিল এসেছেন এই অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে, এবং তার আগেই রাজার সাথে ওর দেখা হয়ে যায়। আশ্চর্য ব্যাপার হল র্যাসেনডিলের চেহারার সাথে রাজার চেহারার অদ্ভুত মিল দেখতে পান রাজা, মনে হয় যেন আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছেন। র্যাসেনডিল কে নিজের প্রাসাদে নিয়ে আসেন। অভিষেকের দুদিন আগেই রাজা অসুস্থ হয়ে পরেন এবং র্যাসেনডিল কে রাজার ভূমিকায় অভিনয় করতে বলেন যতদিন না উনি সুস্থ হোন। ভালোয় ভালোয় অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো ঠিক, তবে সেদিন রাতেই রাজার ছোটভাই রাজাকে বন্দি করে নিয়ে যায়। এরপর কয়েকবছর অনেক চেষ্টার পরও রাজাকে উদ্ধার করা যাচ্ছিল না, তাই র্যাসেনডিলকেই রাজার ভূমিকা পালন করে যেতে হলো।
সেই সময় আসল রাজার বাগদত্তা রাজকুমারী ফ্ল্যাভিয়া আর নকল রাজা র্যাসেনডিল একে অন্যের প্রেমে পরে গেলেন। কিন্তু যখন আসল রাজা ফিরে এলেন তখন রাজকুমারী দেশের শান্তির কথা ভেবে তাকেই বিয়ে করলেন আর র্যাসেনডিল তার দেশ ইংল্যান্ডে ফিরে গেলেন। সেই থেকে বছরে একবার বিশ্বস্ত একজন রুরিতানিয়ার বাইরে লুকিয়ে দেখা করে র্যাসেনডিলের সাথে, রানীর পক্ষ থেকে পাঠানো একটা লাল গোলাপ আর তিন শব্দের একটা চিঠি নিয়ে, ফিরে যাবার সময় আবার র্যাসেনডিলের দেয়া গোলাপ আর চিঠি নিয়ে যায় রানীর জন্য।
এদিকে রাজার সবচেয়ে বড় শত্রু উনার ছোট ভাই মারা যাওয়ার পরও, রুপার্ট অব হেনতযাউ নামক এক বড় শত্রু জার্মানীতে নির্বাসিত অবস্থায় তখনও বেঁচে ছিল। সেখান থেকেই সে রাজা রানীর ক্ষতি কিভাবে করা যায় ভাবছিল সে। এদিকে রাজা রানীর বিয়ের তিন বছর কেটে যাওয়ার পর হঠাত করেই রাজা একদিন সন্দেহ করে বস্লেন রানীকে এবং ভেবে নিলেন ,উনার বন্দি থাকা অবস্থায় রানী আর র্যাসেনডিল হয়ত পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলেছিল। সেই থেকে রানীর সাথে রাজা খারাপ আচরণ করতে শুরু করলেন। এমনিতেই তো রানীর মনে যন্ত্রনা একজনকে ভালোবেসে আরেকজনকে বিয়ে করতে হল বলে, আর এখন রাজার দুর্ব্যবহার রানীর মনের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়ার মতো হলো। রানী তাই এইবার র্যাসেনডিলকে শুধু তিন শব্দের চিঠি না পাঠিয়ে বিশাল এক চিঠি লিখলেন নিজের সব মনের আকুতি শেয়ার করে। রানীর অনুগত ফ্রিতস এইবার চিঠিটা নিয়ে বেশ ভাবনায় পরে গেলেন। এতো বড় চিঠি যদি কোনোভাবে হারিয়ে যায়, অন্য কারো হাতে পরে, তবেই শুরু হবে অশান্তি, রানীর মান সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে।
অনেক সাবধানে ফ্রিতস রানীর দেয়া চিঠি আর লাল গোলাপ নিয়ে ট্রেনে চড়ে রওনা হলেন ওর ভৃত্য কে নিয়ে। ফ্রিতস ভাবতেও পারেনি তার এই ভৃত্যই যে আসলে রুপার্ট এর গুপ্তচর। ট্রেনে ফ্রিতস হঠাত ঘুমিয়ে পরেছিল, ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর তার ভৃত্যকে আর দেখতে পেল না, ওর ব্যাগটা নিয়ে পালিয়েছে। চিঠি আর গোলাপ ব্যাগে নেই, ওর পকেটে আছে ভেবে স্বস্তি পেল সে। ট্রেন থেকে নেমে কোনো গাড়ি খুঁজে পেল না সে, পুরো স্টেশন ফাঁকা, কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে সবকিছু ওর কাছে! গাড়ি না পেয়ে স্টেশন থেকে বের হয়ে হাঁটতে শুরু করল সে এবং কিছুদূর যেতেই আক্রমণের শিকার হল এবং ওকে আঘাত করে ওর কাছ থেকে চিঠি আর গোলাপের বাক্সটা ছিনিয়ে নিল রুপার্ট। এগুলোকে রাজার কাছে পৌঁছিয়ে রানীর সম্মান নষ্টের পাশাপাশি দেশে একটা অরাজকতা সৃষ্টি করাই ওর মূল উদ্দ্যেশ্য।
এদিকে চরম অসহায়ত্ব আর ভয় নিয়ে ফ্রিতস কোনো রকমে র্যাসেন্ডিলের কাছে পৌঁছে সব জানাল। র্যাসেনডিল ঠান্ডা মাথার মানুষ,স্থির হয়ে আগে সব শুনে তারপর আস্তে ধীরে ঠিক করলেন কিভাবে কি করলে রাজার হাতে চিঠিটা পৌঁছাবে না। প্রথমে রুরিতানিয়ায় ফ্যাক্স করে জানিয়ে দিলেন চিঠি আর গোলাপ হারানোর কথা এবং রুপার্টকে যেন কোনোভাবেই রাজার সাথে দেখা করতে দেয়া না হয় সেটাও জানালেন। ফ্রিতসের আঘাত সারিয়ে তুলতে ডাক্তার ডাকলেন আর ওর ভৃত্য জেমসকে ফ্রিতসের সেবায় নিয়োজিত করে র্যাসেনডিল গেলেন রুরিতানিয়ায়, যেখানে সে নকল রাজা সেজে এক সময় শাসন করেছিল।
জীবনের ঝুঁকি নিয়েই র্যাসেনডিল পরিখা সাঁতরে পেরিয়ে ঢুকল রাজপ্রাসাদের ভেতর, রানীর সম্মান বাঁচাবার জন্য! কারণ যে করেই হোক রাজার হাতে চিঠি পৌঁছাবার আগেই তাকে সেটা হাত করতে হবে। রানীর আরেক অনুগত কর্নেল স্যাফট র্যাসেনডিলকে দেখে প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও, পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ওকে দ্রুত প্রাসাদে ঢুকিয়ে নিল অন্য কেউ দেখে ফেলার আগেই, নিয়ে গেল রাজা এসে যে রুমে থাকেন সেখানে। রানীও তখন অস্থির সময় কাটাচ্ছিল তার গোলাপ আর চিঠি ঠিকভাবে পৌঁছল কিনা তা নিয়ে, এবং আর থাকতে না পেরে খবর জানতে নিজেই ছুটে এসেছিল স্যাফটের কাছে, কিন্তু এসে দেখা হয়ে গেল র্যাসেন্ডিলের সাথে। তিন বছর পর ভালোবাসার মানুষকে দেখতে পেল তারা, এক আবেগঘন সম্পর্কের সৃষ্টি হল সেখানে। কিন্তু রানীকে চলে যেতে হল , কারন নষ্ট করার মতো সময় তখন তাদের কাছে ছিল না। রুপার্টের ভাই রিশেনহেইম রাজার খুব প্রিয়ভাজন এবং বিশ্বস্ত লোক, তাকে লোভ দেখিয়েই রুপার্ট নিজের দলে ভিড়িয়েছিল, এবং তাকে দিয়েই চিঠির নকল একটা কপি করে পাঠিয়েছিল রাজার হাতে পৌঁছাবার জন্য। কিন্তু রুপারটের প্ল্যান ছিল রাজা আগে নকল চিঠি দেখার পর, সে আবার আসল চিঠিটা নিয়ে রাজার সাথে দেখা করতে, কিন্তু ভেস্তে দিল র্যাসেন্ডিল, রিশেনহেইম বন্দি হলো ওদের হাতে, এবং আপাতত রাজার হাতে চিঠিটার নকল পরার দুশিন্তা থেকে মুক্ত হলো তারা এবং রুপার্টের কাছ থেকে এইবার কি করে আসল চিঠিটা উদ্ধার করা যায় সেই চিন্তায় মগ্ন হলো তারা। রিশেনহেইম কে দিয়ে জোর করে ফ্যাক্স করাল রুপার্টের কাছে যে, রাজা চিঠিটা পায়েছেন এবং রুপার্ট কে হান্টিং লজে দেখা করতে বলেছেন। রাজা তখন বনে শিকার করতে যায়। তারা ভেবেছিল শিকার শেষে রাজা প্রাসাদে ফিরে আসলে, হান্টিং লজে একটা ফাঁদ পাতবে রুপার্টের জন্য, র্যাসেনডিল রাজা সেজে অপেক্ষা করবে আর ওর কাছ থেকে আসল চিঠিটা নিয়ে নিবে। কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় হলো না , রাজা শিকার করে ক্লান্ত হয়ে পরলেন আর জানালেন পরদিনও উনি হান্টিং লজে থাকবেন।
এদিকে রুপার্ট কোথায় থাকে সেই খোঁজ পেয়ে র্যাসেন্ডিল ওকে আটকাতে সেদিকে রওনা হয়ে গেলেন, আর যদি তার আগেই রিসেন্ডিল হান্টিং লজের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হয়ে থাকে তাহলেও যেন অন্তত রাজার সাথে ওর দেখা না হয় সেটার জন্য হান্টিং লজের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হলেন স্যাফট আর ফ্রিতস। গিয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন। তারা পৌঁছাবার আগেই সেখানে রুপার্ট পৌঁছেছিল এবং রাজা ওকে দেখে উত্তেজিত হয়ে যায়, ওকে গুলি করতে বন্দুক বের করে, রাজার কুকুরও অচেনা রুপার্ট কে দেখে ঝাঁপিয়ে পরে এবং রুপার্ট আত্মরক্ষার জন্য গুলি করে। রাজা আর কুকুরটা মৃত্যুবরণ করেছে আর ওদের সাথে থাকা ভৃত্য কে আহত অবস্থায় পরে থাকতে পায় তারা। ভৃত্যর কাছ থেকেই পুরো ঘটনা টা জানতে পারে তারা, এরপর সেই ভৃত্যেরও মৃত্যু হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে যায় তারা। কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। রাজার মৃত্যু হয়েছে জানানো মানে দেশে বিশাল বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করা, এরপর রুপার্টের কাছে আছে রানীর প্রেমিককে লেখা চিঠি, মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। তাই তারা এখন এই সবই গোপন রাখবে এবং সবাইকে জানাবে যে, রাজা এখন অসুস্থ তাই হান্টিং লজে কিছুদিন থাকবে বলে জানাবে সিদ্ধান্ত নিল ওরা। রানীকেও মৃত্যু সংবাদ জানানো যাবেনা এখন, আগে রুপার্ট কে খুঁজে বের করতে হবে।
(এরপর ঘটে অনেক ঘটনা, এতোকিছু আমি আর লিখতে পারছি না, দুঃখিত)
অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে র্যাসেনডিল রুপার্টের মুখোমুখি হয় এবং তাকে হত্যা করে চিঠিটাকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। র্যাসেনডিলকে যারাই দেখে তাকে রাজা বলে সম্বোধন করতে থাকে, তার নামে জয়ধ্বনি করতে থাকে। রানী এবং তার অনুগতরা আবারও রাজার শূন্যস্থান পূরন করতে র্যাসেনডিলকে রাজার ভূমিকা পালন করতে বলে। এতে রাজার মৃত্যু সংবাদ প্রজাদের জানতে হবে না, প্রজারা তো তাকে রাজা বলেই জানে। কিন্তু র্যাসেনডিল এটা মানতে চাইলেন না, তার আত্মসম্মানবোধ প্রবল। রাজার মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে সে এখানে রাজার অভিনয় করে গেলে নিজের কাছে চিরদিন সে ছোট হয়ে থাকবে।
কিন্তু তারপরও সবাই তাকে অনুরোধ করে রানীর দিকে তাকিয়ে অন্তত আবার সময় নিয়ে ভাবতে, বোঝায় সে রাজা হলে সবাই ভালো থাকবে। কিন্তু র্যাসেনডিল একা ভাবার জন্য বাগানে হাঁটতে যায়, প্রায় সারারাত ধরে ভেবেও সে যেন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছিল না, অবশেষে সবাই আবার তার সিদ্ধান্ত জানতে বাগানে আসে। তাদের ধারনাও ছিল না কারো যে একটা শত্রু এখনও উৎ পেতে আছে তাদের ক্ষতি করার জন্য, সে হল সেই ফ্রিতসের পালিয়ে যাওয়া ভৃত্য। সেই ভৃত্যই সবার অলক্ষ্যে বাগানে এসে গুলি চালায় আর মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে র্যাসেনডিল, মৃত্যু হয় আরেক রাজার যে কিছুদিনের জন্য হলেও এ রাজ্য শাসন করেছিল, কিন্তু সে রানী ফ্ল্যাভিয়ার হৃদয় রাজ্য শাসন করতে ঠিক রয়ে যায়।
শেষটা সত্যিই মেনে নেয়ার মতো না !! একটা চিঠির গোপনীয়তা রক্ষার জন্য মৃত্যু হল দুই রাজার!!
গল্পটা পড়ে খুব দুঃখ পেয়েছি ঠিক , তবে উপলব্ধি করছি যে-
গুরুত্বপূর্ন পদে অধিষ্ট কোন ব্যক্তির সামান্য আবেগের বশবর্তী হয়ে করা কোনো কাজের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে!! সামান্য আবেগ অপূরনীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়!
রানী ফ্ল্যাভিয়া যেহেতু ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে রাজাকে বিয়ে করে এতো বড় সেক্রিফাইস করতে পেরেছিল দেশের মানুষের কথা ভেবে, তাই সামান্য আবেগ কে পাত্তা দিয়ে এতো বিশাল রিস্ক নিয়ে কয়েকটা শব্দের চিঠি আদানপ্রদান করার ব্যাপারটা মেনে নেয়া যায় না এবং ফলাফলও তাই এতোটা ভয়ংকর হলো।
![]()
