Fiction : Games at Twilight
                 By : Anita Desai

 

অনেক গরম পড়ছে , বাইরে খেলার মতন অবস্থা নেই । তারা তাদের চা পর্ব শেষ করেছে , হাত-পা ধুয়েছে , চুল চিরুনি দিয়ে আঁচড়িয়েছে । অনেক দিন পর সবাইকে একসাথে বন্দী অবস্থার মধ্যে পাওয়া গেলেও , সেখানে শান্ত অবস্থা নেই । শুধু প্রশান্তির ব্যাপার এই , সূর্যের দহন থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পেরেছে । বাচ্চাকাচ্চারা বাইরে যাবার জন্য জেদ করেই চলছে । তাদের চোখ , মুখ লাল হয়ে গেছে । কিন্তু তাদের মা তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় , কিছুতেই দরজা খুলবে না । কিন্তু বাইরে কোন আওয়াজ নেই । মনে হচ্ছে , বাচ্চাদের মুখে তুলা দিয়ে গুঁজে মুখ বন্ধ রাখা হয়েছে , নাক যেনো বালি দিয়ে ঠেসে রাখা হয়েছে । তারা যদি বাইরের আলো , সূর্য , বাতাস না পেলে , মনে হচ্ছে , তারা দম বন্ধ করে মারাই যাবে ।

“মা , প্লিজ , প্লিজ মা ” তারা অনুরোধ করতে থাকলো । “আমরা বারান্দা আর উঠানে খেলবো । বারান্দার বাইরে এক পাও দিবো না ”

” তোমরা করবে , আমি জানি । তারপর —-”

“না , আমরা করবো না । আমরা করবো না ”

“না , আমরা করবো না , আমরা করবো না ” ভীষণভাবে বিলাপ করতে থাকলো । উপায় না দেখে , তিনি সামনের দরজাতে খিল মেরে দিলেন যাতে আওয়াজ না যায় । মটরশুঁটির ছোলানো সময় ” কচকচ ” ধরনের আওয়াজ করে । তাদের চিৎকার বাইর থেকে ঠিক সেই রকম শোনা যাচ্ছে । তাদের কান্নাকাটির প্রতি তাঁর কোন ভ্রূক্ষেপ নেই । গোসল শেষে ট্যালকম পাউডার গায়ে দিলেন । তখন গ্রীষ্মকাল । সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে । তিনি একটি পরিষ্কার শাড়ি পরলেন।

পুরো বিকেল বেলটা অনেক গরম পরেছে । বারান্দার দেয়ালের রঙ মনে হচ্ছে যেনো জ্বলে যাবে । সেখানে কাগজফুলের গাছ আছে , রক্তবর্ণ , ম্যাজেন্টা রঙের সেগুলো । বাগানের বাইরের জায়গাটা তপ্ত তাম্রবর্নের আকার ধারণ করেছে । লাল নুড়ি দিয়ে বানানো পাথরের রাস্তাটা মনে হচ্ছে অ্যালুমিনিয়ার , টিনের মতন ধাতু দিয়ে বানানো হয়েছে । কোন প্রানী এই ধরনের পরিবেশে বাঁচতে পারে না । পাখিগুলোও চুপসে পড়েছে । কাঠবিড়ালিগুলো বাগানের পানির কলের নিচের নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে । বাইরের বারান্দার উপর কুকুর পা ছেড়ে এমন ভাবে শুয়ে যেন পানির অভাবে মারা যাবে । চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাচ্চাদেরকে দেখছে । লেজ নাড়াতে চেষ্টা করে পারে নি । শুধু চোখ পিট পিট করে শুয়ে আছে ।

হঠাৎ , হঠাৎ , বাচ্চাদের চিৎকারে গাছের উপর থাকা টিয়া পাখির দল ভয়ে কেঁপে উঠে । গরম বাতাস ভেদ করে দল বেঁধে ডিগবাজি দিতে দিতে উড়ে চলে যায় ।

বাচ্চারা এখন এক্তু থেমেছে । বাচ্চারা কেউ কেউ এক জন একজনকে গুঁতোচ্ছে , কেউ ধাক্কা মারছে । কেউ ডিগবাজি খেলছে । তারা তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে । বাচ্চাদের আর কি কাজ ! – খেলা ।

“চলো , লুকোচুরি খেলি । ”

“কে চোর হবে ?”

“তুমি হবে । ”

“কেন আমি হবো ? তুমি হবে – ”

“কারন তুমি বড় –”

“তা হয় না ”

ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে গিয়েছে , কেউ লাথি মারা শুরু করে দিয়েছে । মিরা সামলাতে চলে এসেছে । তিনি তাদেরকে টেনে আলাদা করে সরিয়ে ফেলেছে । একজনের জামার ছেঁড়ার শব্দ পাওয়া গেলো । কিন্তু তাদের রাগ মোটেই কমে নি । জামার হাতা যে ছিঁড়ে গেছে সেইদিকে কারোর কোন খেয়াল নেই ।

“গোল হয়ে দাড়াও , গোল হয়ে দাড়াও !! ” তিনি চিৎকার করলেন । যতক্ষণ না সবাই গোল হয়ে না দাঁড়ায় তিনি সবাইকে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিতে লাগলেন । “এখন সবাই হাততালি দাও” হাততালি দিতে দিতে জোরে জোরে বললেন । “ডুব , ডুব , ডুব – আমার নীল জাহাজ—” মাঝে মাঝে একজন আরেক জনের দিকে তাকিয়ে দেখে , তাদের হাত পরস্পরের সাথে লেগে যাচ্ছে কি না । হাতের তালুর সাথে তালু , তারপর , হাতের পিঠের সাথে বাজিয়ে – সবাই এক সাথে খুশিতে চিৎকার দিয়ে ওঠে ।

রঘুও সেখানে ছিল । সে কেঁদে কেঁদে প্রতিবাদ করা শুরু করলো । “”তুমি ঠকিয়েছো – মিরা ঠকিয়েছো – আনু ঠকিয়েছো — ‘ কেউ তাঁর কথা শুনলো না , তারা সবাই সরে পড়লো । সে চিৎকার দিয়ে বলছে “বারান্দায় — বারান্দায় — মা বলেছে – বা বলেছে বারান্দায় থাকতে । ” তাঁর কথা শুনে কেউ থামলো না । লতাপাতার মধ্য দিয়ে তাদের পা দেখতে পেলো । কেউ ইটের দেয়াল গুলোতে একে একে করে উঠার চেষ্টা করছে । বাগানের সারের গাদার উপর দিয়ে লাফালাফি করছে ।তারপর কাগজফুলের ছায়ার চারপাশ নিরব হয়ে গেলো । পুরো বাগানে নিস্তব্ধতা নেমে আসলো । এমন কি কাঠবিড়ালিগুলোও দরে পড়লো । চারদিক মুহূর্তেই শুন্যতা নেমে আসলো ।

শুধু , ছোট মানু হঠাৎ করে বেরিয়ে আসলো । মনে হলো মেঘের উপর থেকে টুপ করে পড়েছে । অনেক উঁচুতে উড়তে থাকা ঈগল পাখির থাবা থেকে পড়ার পর মানুষ কিচ্ছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকে , কই আসলাম , কেমনে কি হলো আরও অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক করে । ঠিক তেমনি মানু চুপ করে কিছুক্ষন মাঠে দাড়িয়ে রইলো । মুখে আঙ্গুল দিয়ে চুষছে । রঘুর চিৎকার কানে প্রবেশ মাত্রই তাঁর আবার কান্না শুরু হলো । রাঘু দেয়ালের দিকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে জোরে জোরে সংখ্যা গুনছে – ” তিরাশি , পঁচাশি , নিরানব্বই , নব্বই — ” এই গুনতে থাকা সংখ্যাগুলো শুনে মানু ভয় পেয়ে গেলো । একবারে উত্তরের দিকে , নয়তো আরেকবার দক্ষিনের দিকে ছুটছে । তাঁর প্যান্টের এবং লাল জুতা থেকে আলোর ঝলকানি রঘুর চোখে পড়া মাত্রই , হৈ হৈ চিৎকার দিয়ে তাকে ধরার জন্য ছুটতে শুরু করলো । রক্ত হিম হওয়া চিৎকার শুনে মানু পানির পাইপে সাথে আঘাত লেগে হোঁচট খেয়ে রাবারের কয়েলে পড়ে গেলো । তারপর কান্না করতে করতে বললো – “আমি চোর হতে চাই না – তুমি তাদের সবাইকে খুজে বের করতে হবে – সবাইকে -সবাইকে – সবাইকে !!”

“আমি জানি , ইডিয়ট , সবাইকে খুঁজে বের করতে হবে ” রঘু তাচ্ছিল্য সহকারে বলতে বলতে পা দিয়ে তার গায়ে একটা লাথি মেরে দিলো । “তুমি মরে গেছো ” আত্নতৃপ্তিতে জিহ্বা দিয়ে ঘাম মাখা ওষ্ঠ মাখতে মাখতে সে বললো । তারপর সদর্পে বাকি শিকারের পিছনে ছুটতে শুরু করলো । মুখে জোরে জোরে ভোঁ ভোঁ শব্দ করতে থাকলো, যাতে তারা ভয় পেয়ে যায় ।

রাভি তাঁর ডাক শুনতে পাচ্ছে । ভয়ে নাক টানা শুরু করে দিলো । হাত নাড়িয়ে ভাল একটা গর্ত সন্ধানের প্রয়াস করতে থাকলো । অবশেষে একটি সুড়ঙ্গের মধ্যে নিজেকে ধুকিয়ে ফেললো , কিন্তু পুরোপুরি নিজেকে আড়াল করতে পারে নি । গ্যারেজের পিছনে উপুড় হয়ে থাকা টবের উপর বসে ছিলো । কিন্তু কোথায় লুকাবে ? রঘুর চিৎকার ক্রমেই নিকটে আসছে । সে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকলো । কিন্তু লুকানোর জায়গা পেলো না । কিন্তু রঘুর লম্বা লম্বা পা আর তাঁর ছোট ছোট পা । এই ব্যাপার নিয়ে তেমন সে চিন্তিত না । রঘু ফুলগাছের পাতাগুলোর চারদিকে নাড়াতে থাকলো । লজ্জাবতী গাছগুলোর পায়ের মাড়া ফলে একে একে নুয়ে পড়তে থাকলো । তা দেখে রাভির ভয়ে কাঁপতে থাকে , ঢোঁক গিলতে থাকে ।

গ্যারেজে ভারি এক তালা দিয়ে আটকানো । চাবি ড্রাইভারের কাছে , রুমে আছে সে । পেরাকে ঝুলতে থাকা শার্টের পকেটে চাবি খানা আছে । রাভি রুমে উঁকি মারলো । দেখলো , ড্রাইভার গেঞ্জি আর অ্যান্ডারপ্যান্ট পড়ছে । নিঃশ্বাসের তালে তালে নাকের ভিতর চুলগুলোও নড়ছে । রাভির ইচ্ছা হলো , যদি পেরাকটাকে সে ছুঁতে পারতো !! কিন্তু তা অসম্ভব । পেরাক তাঁর থেকে অনেক উঁচুতে । দেয়ালে কাঁত হয়ে মন খারপ হয়ে টবে বসে পড়লো । একমাত্র সেটিই তাঁর মাপমতন হয়েছে ।

কিন্তু গ্যারেজের পাশে আলাদা সবুজ দরজার একটা চালা ছিলো । সেটাও তালা মারা । চাবি কার কাছে কেউ জানে না । সেই চালা এক বছরের বেহি সময় ধরে কেউ খুলে না । যখন মা ঘরের ফেলনা জিনিষ , ভাঙ্গাচোরা ফার্নিচার ফেলার দরকার হলে এইখানে ফেলে । সেই সব জিনিসে ধুলা পড়ে আছে । মাকড়সার বাসাও তৈরি হয়েছে । এমন ভাবে ভাঙ্গাচোরা জিনিষ দিয়ে স্তুপ করে রাখা হয়েছে , ছোটখাট ধ্বংস প্রাপ্ত শহর বললে ভুল হবে না । সবুজ ছোট ছোট গাছ দেয়ালে ঝুলে আছে । দরজা , দেয়ালে মরিচা , শেওলা ধরেছে । সেখানে একটি ছোট গর্ত তৈরি হয়েছিলো , বড় একটি ইঁদুর , কুকুর সহজে ঢুকে যেতে পারবে । রাভিরও ভালমতন জায়গা হতে পারে ।

অন্ধকারকে রাভি ভয় পায় না । যেভাবে জায়গাটাকে ভাঙ্গাচোরা জিনিষ দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে যে কোন সুস্থ প্রানির জন্য তা কবরস্থান হতে পারে । কিন্তু রাঘুর তীক্ষ্ণ স্বর ক্রমেই ধেয়ে আসছে । সব কিছু মাড়িয়ে , তন্ন করে খুজা হচ্ছে তাকে । হঠাৎ রাভি ফুলের টব থেকে পিছলে পড়ে গেলও ।সাথে টবও ফেটে গেলও । ভাঙ্গার আওয়াজে অবাক হয়ে গেলো সে । কিন্তু স্তম্ভিত হবার পরিবর্তে সে সাহস করে হাসতে থাকলো যাতে রঘু শুনতে পায় , আর নিজে সোজা দাঁড়িয়ে থাকে । শেষে রঘু চিৎকার দিতে দিতে বলে , “আমি শুনেছি ! আমি আসছি ! ধরেছি -” ফুলের টবের দিকে সে ছুটে আসতে থাকলো । গ্যারেজে তাঁর পা পড়ার সাথে সাথে ধুলা উড়তে থাকলো । দরজার দিকে পিঁপড়ের ঢিবি । দাঁত খেছিয়ে গর গর করতে করতে আসছে সে । হাতে লাঠি নিয়ে গ্যারেজে বাড়ি মারতে মারতে চলছে ।

রাভি খুশিতে নেচে উঠলো । খুশির রেশ কেটে যেতেই তাঁর মনে একটু ভয় কাজ করতে থাকলো । চালার ভিতরের জায়গাটা অন্ধকার , ভুতুড়ে । এক ধরনের চাপা গন্ধ কাজ করছে সব জায়গায় , কবরের মতন । রাভি একদিন এই জায়গায় লিনেন কাপবোর্ডে আটকে গিয়েছিলো । উদ্ধার পাবার আগে এক ঘণ্টা ধরে কাঁদছিলো । তাঁর কাছে এটি লুকানোর জন্য পরিচিত জায়গা ছিল । এক ধরনের লন্ড্রির , মাড়ের গন্ধ ছিল বোর্ডে । তাঁর মা তাকে অনেক কষ্টে শান্ত করেছিলো তখন । কিন্তু চালাতে এখন ইঁদুর , উইঢিবির , ধুলা , মাকড়সার বাসার গন্ধ চারিদিকে । পুরো জায়গাটা তাঁর কাছে অপিরিচিত , এক ধরনের অজানা ভয় ঘিরে আছে চারিদিকে । দরজার সামনে ছাড়া আর কোন দিকে কোন লাইট নেই । ছাদ অনেক নিচে । যদিও রাভি ছোট , সে আঙ্গুল দিয়ে তা ধরার চেষ্টা করেছে। সে তাঁর নিজের শরীরটা বলের মতন কিছুটা বাঁকিয়ে , চুপ চাপ দাঁড়িয়ে আছে যাতে শব্দ না হয়। অন্ধকারে কি কিছু দেখার চেষ্টা করছে ? ঠাণ্ডা , চিকন কিছু একটা – সাপের মতন । সাপ ? ,রঘুর লাঠির দিয়ে দেয়ালে আঘাতের শব্দ শুনে , রাভি লাফ দিয়ে উঠলো । তারপর সে শুনে দ্রুত বুঝতে পারলো সেটা লাঠি ছিল , তারপর কিছুটা স্বস্তি পেলো ।

কিন্তু রঘু দ্রুত সরে গেলো । গ্যারেজে তাঁর পায়ের কোন আওয়াজ নেই । রাভি স্থির হয়ে সেখান আছে । তারপর কাঁপতে শুরু করলো । তাঁর ঘাড়ে এক ধরনের সুড়সুড়ি অনুভব করলো । সাহস করে ঘাড়ে হাত দিয়ে বুঝতে পারলো সেটা পোকা ছিলো – মাকড়সাও হতে পারে । সে এক বাড়ি দিয়ে সেটা ভর্তা করে ফেললও । তারপর সে চারদিকে চোখ দিয়ে ভাবতেই দেখে অবাক হয়ে যায় , কতও ধরনের প্রাণী তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে । তার কাছে আসার জন্য , ধরার জন্য অপেক্ষা করছে ।

নতুন কিছু নেই আর । সেখানে সে এখনও দাঁড়িয়ে আছে । ঘাড়ে এখনো হাত দেয়া । দলিত মাকড়সার লেপন আস্তে আস্তে করে শুকিয়ে যাচ্ছে । এক মিনিট করে করে এক ঘণ্টা পার হতে চলছে । দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর পা কাঁপা শুরু করেছে । এখন চোখ চারিদিকে নিতেই , অন্ধকারে সে সবকিছু চিনতে পারছে । ওয়ারড্রব , ভাঙ্গা ঝুড়ি , ভাঙ্গা খাট তাঁর চারিদিকে স্তুপ করে পরে আছে । পুরান বাথটাবকে দেখে সে চিনতে পারলো । সেটার ধারের কাছে বসে সে একটু নিচু হলো ।

সে বেরিয়ে এসে হাঙ্গামার মধ্যে যোগ দেবার জন্য মনে মনে চিন্তা করলো । সে ভাবলো এখানে রঘু নেই , মনে হয় সে সূর্যের আলোর কাছে বা লাইটের কাছে । বাগানের ফাঁকা জায়গাতেও বা তাঁর ভাই , বোন সে সাথেও থাকতে পারে সে । সন্ধ্যা দ্রুত গড়িয়ে আসছে । খেলাটা আরেকটু চলতে পারতো । বাবা মা এখন বোধ হয় বেতের চেয়ারে বসে আছে । বা বাগানে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে তুঁত গাছের ফল বাছাই করছে বা জাম গাছের নিচে জাম টুকাচ্ছে । মালি পানির পাইপ দিয়ে চারা গাছে পানি দিচ্ছে । সেই পানি বাতাসের মধ্য দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে হলুদ ঘাসকে সিক্ত করছে । আর্দ্র মাটির ঘ্রাণ , সবুজ ঘাসের মিষ্টি গন্ধে চারিদিক মেতে রাখে । রাভিও সেই ঘ্রাণ পেলো । আস্তে আস্তে করে বাথট্যাব থেকে উঠে দাঁড়ালো । তাদের থেকে এক মেয়ের গলার স্বর শুনতে পেলো , রঘু তাকে ধরে ফেলেছে । ঘাস , লতাপাতা , মাড়িয়ে আসার শব্দ শুনতে পাচ্ছে রাভি । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটি বলেছে _ “আমি গুহা ছুঁয়ে ফেলছিলাম –” “তুমি করো নি ” “আমি করেছি –” “তুমি মিথ্যুক – তুমি করো নি ” – আস্তে আস্ত করে সেই কথাগুলো মিলিয়ে গেলো । চারদিকে নিশব্দতা নেমে আসলো ।

রাভি আবার বাথটাবের ভাঙ্গা প্রান্তে বসে পড়লো , আরও কিছুক্ষন থাকার চিন্তাভাবনা করছে সে ।সবাই যদি ধরা পরে যায় , তাহলে মজা কি খেলাতে ! তাকে জিততে দেয়া যাবে না । কি মজা হয় তখন যখন তাঁর চাচা তাকে খুঁজে বের করে নিয়ে যায় , তারপর চকোলেট কিনে দেয় । নয়তো , ঘোড়ার গাড়ি করে ঘুরতে চলে যায় , নয়তো ড্রাইভার নিয়ে ঘুরতে বের হয়ে পড়ে । রাঘু লোমশ , স্বর একটু কর্কশ শুনতে । দেখতেও স্বাস্থ্যবান । ফুটবল বা যে কোন খেলায় সমবয়সী যে কোন ছেলেদের তুলনায় সে এগিয়ে । তাকে হারাতে পারার মজাটায় একটু অন্যরকম । রঘু হাঁটু দুটো এক সাথে করে লাজুক করে একটু হাসলো যেনো বিজয়ের তাঁর হাতছানি দিয়ে ডাকছে ।

তারপর সে মুখে হাসি নিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লো । মাঝে মাঝে উঠে একটু দরজার কাছে যায় , কান পেতে খেলার হৈ চৈ শুনে । কিছুক্ষন সেখানে দাঁড়িয়ে আবার তাঁর সিটে চলে আসে । খেলায় জয়ী হবার সিদ্ধান্তে অটল সে , রেকর্ড ভাঙার স্বপ্নের বিভোর , চ্যাম্পিয়ন হবার নেশায় মন এখন মাতোয়ারা । অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে সে ।

আস্তে আস্তে করে চালার ভিতর অন্ধকার বাড়তে থাকে । দরজার লাইটের আলো হাল্কা , ঝাপসা হয়ে পড়ে । হ্লুদ ধুলিকনাগুলো আস্তে আস্তে হলুদ , সবুজ সূক্ষ্ম রোমের আকার ধারণ করে । পানি মাটিতে পড়ছে । সবুজ মাটির গন্ধে তার মনে ঠাণ্ডা , শীতলতা এনে দিলো । রাভি ছিদ্র দিয়ে দেখলো গ্যারেজ পার হয়ে মাঠে এক বেগুনী বর্ণের ছায়া পড়ছে । তার পরেই সাদা রঙের বাড়ির দেয়াল । কাগজ ফুলের গাছ কিছুটা পাংশু বর্ণের আকার ধারণ করেছে । ঘরে আসা চড়ুই পাখিদের কিচিরমিচিরে ডাল কেঁপে উঠছে । বাগানের ঝোপঝাড় দেখা যাচ্ছে না । ছেলেমেয়েদের শব্দ কি শুনতে পাচ্ছে সে ? মনে হচ্ছে সে পারছে । তাঁর মনে হচ্ছে , কেউ গান গাচ্ছে , হাসছে । কিন্তু খেলার কি হচ্ছে ? কি হলো ? খেলা কি শেষ হয়ে গিয়েছে ? তাকে তো এখনো ধরতে পারি নি তবে ?

এটি দেখতে গিয়ে তাঁর খেয়াল নেয় সে অনেক্ষন আগে অনেক আগে বেরিয়ে পড়েছে । দেখতে দেখতে উঠান থেকে বারান্দায় চলে এসেছে । কিন্তু তাঁর জেতার জন্য গর্ত ছোঁয়ার দরকার ছিল । সে ভুলে গেছে । তাঁর শুধু মনে আছে , চোর পুলিশের খেলায় চোরদের মধ্যে একজন । সে সবকিছু ভাল করে করেছে , জয় তাঁর দখলে ছিল । কিন্তু সে ভুলে গেছে দৌড়ে দড়ি যদি আগে না ছুঁতে পারলে বিজয় হওয়া সম্ভব না । জিততে হলে তাকে যে করেই হোক গুহা ছুঁয়ে চিৎকার করে বলতে হবে “ছোঁয়া , “ছোঁয়া “ছোঁয়া । ”

সে কান্নাকাটি শুরু করলো , পরে গেছে সে । উঠে দাঁড়াতেই , আবার লাঠির আঘাতে হোঁচট খেলো । পা অবশ হয়ে পড়ছে তাঁর । কাঁদতে কাঁদতে সে বারান্দায় এসে পৌঁছল । এক লাফ দিয়ে সে পিলার ছুঁয়ে চিৎকার করে বললো, ” ছুঁয়া , ছুঁয়া ” । তাঁর চিৎকার চারিদিকে থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসলো । বুকভরা কান্না তাঁর চোখে মুখে , অনেক কষ্ট হচ্ছে তাঁর ।

মাঠে ছেলেমেয়েরা কথা বন্ধ করে দিলো । সবাই অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে । তাদের মুখ সবার পাংশু বর্ণের মতন দেখতে লাগছে । গাছপালা , ঝোপ ঝাড়ের জায়গায়টায় অন্ধকার , চারদিকে সুনসান পরিবেশ । তাদের থেকে লম্বা ছায়া অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়ে পড়েছে । তাঁর চিৎকার , আবেগ দেখে সবাই অবাক হয়ে আছে । তাদের মা চেয়ার থেকে উঠে তাঁর কাছে এসে বললেন , “থামো , থামো , রাভি । বাচ্চাদের মতন কান্নাকাটি করো না । কেউ তোমাকে আঘাত দিয়েছে ? ” তাকে দেখার পর ,ছেলেমেয়েরা আবার ঘুরে হাততালি দিতে খেলা শুরু করলো ।, মুখে মুখে ছন্দ কাটছে তারা , “ঘাস সবুজ , গোলাপ লাল –”

কিন্তু রাভির কোন ভ্রূক্ষেপ নেই । সে তাঁর মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলো । সবুজ মাঠে মাথা নিচু করে বলছে “আমি জিতেছি , আমি জিতেছি । ” তারা যাতে অবাক হয়ে শুনে তাই , কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলছে , ” রঘু আমাকে খুঁজে পাই নি । আমি জিতেছি আমি জিতেছি ”

এক নিঃশ্বাসে কিছুক্ষন বলার পর একটু শ্বাস নিলো । তারা তাকে বলতে গেলে ভুলেই গিয়েছিল । রঘু তাদেরকে অনেক আগেই বের খুঁজে বের করে ফেলেছে । বরং পরের পুলিশ কে হবে সেটা নিয়ে তারা ঝগড়া করছিলো । মা গোসল থেকে এসে তাদের খেলে লন্ডভণ্ড করে দিয়ে পরে তাদেরকে আরেক খেলা খেলতে বলে , তারা একের পর এক খেলা খেলেই চলছে । জাম যা গাছ থেকে নিচে পরেছিলো তাও তারা খেয়ে ফেলেছে । যখন তাদের বাবা কাজ থেকে ঘরে এসেছে , ছেলেমেয়েরা গাড়ির ড্রাইভারকে সাহায্য করছিলো । বীজতলায় মালির সাথে তারা পানি দিচ্ছিলো । মালি তাদেরকে ভয় দেখানোর পরে তারা পালিয়ে যায় । তাদের বাবা মা ফিরে এসে বেতের চেয়ারে বসে । বাচ্চারা আবার খেলতে শুরু করে । কেউ রাভির কথা মনে করে নি । তাদের খেলা থেকে সরে যাবার পরে , তাদের মন থেকেও তারা মুঝে যায় ।

“বোকামি করো না ” তাকে একদিকে ধাক্কা দিয়ে রঘু কড়া ভাবে কথা বললো । এমনকি মিরা বললো , “কান্না বন্ধ করো , রাভি । যদি তুমি খেলতে চাও , তাহলে তোমাকে লাইনে সবার শেষে এসে দাঁড়াতে হবে । ”

খেলা শুরু হলো । একের অপরের হাত ধরে বৃত্ত তৈরি করে । তারপর মাথা নুয়ে কবিতা বলা শুরু করলো ।

“ঘাস সবুজ ,
গোলাপ লাল
আমাকে মনে রেখো
যখন আমি মারা যাবো , যাবো , যাবো ”

গোধূলি বেলায় বৃত্তের ভিতর চিকন ছোট হাতগুলো কাপছিলো । মাথাটাকে কষ্টে নুয়েছিল সবাই । পা নাড়াচ্ছিলো সবাই তালে তালে । রাভি তাদের সাথে তাল মেলাতে পারছে না । সে তাদেরকে অনুসরণ না করলেও হতো । তাঁর শেষ খেলায় অংশগ্রহন না করলেও হতো । সে বিজয় চেয়েছিলো , জয়ধ্বনি চেয়েছিলো -সমাপ্তি চাই নি । কিন্তু সে ভুলে গিয়েছে , বাদ পরে গেছে আবার । সে এখন আরযোগ দিতে পারবে না । অপমান, যন্ত্রণার কথা আস্তে আস্তে করে ভুলে যাচ্ছে সে – হৃদয় ভারি হয়ে উঠছে , তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে তাঁর । ঘাসের উপর সে পুরো শুয়ে পড়লো । ঘাস তাঁর মুখের উপর পরে আছে । সেখানে আর কোন কান্না নেই । সেখান তাচ্ছিল্য ভরা করুন অভিজ্ঞতা নিঃশব্দে গ্রাস করে আছে ।

translated from: Games at Twilight

আরও গল্প পড়তে ক্লিক করুনঃ

The Garden Party by KATHERINE MANSFIELD

প্রথম স্কুলে যাবার দিনঃ ছোট গল্প

Araby by James Joyce 

The Ant and The Grasshopper

I Have A Dream -Martin Luther King 

Tagor-Letter to Lord Chelmsford Rejecting Knighthood 

Abraham Lincoln-Gettysburg Address

Of Studies by Francis Bacon

Shooting an Elephant  

The Most Dangerous Game

A Double-Dyed Deceiver 

HEARTACHE

The Luncheon

The Gift of Magi

A MOTHER IN MANNVILLE

Games at Twilight by Anita Desai : Bangla Translation